সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০০৯

সময়ের কথা

সময় নিয়ে আমি একবার ভারি মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলাম। ফিরে ফিরে মাথার ভেতর একই প্রশ্ন- সময় কী? আমরা সময় দেখি না। দেখি ঘটনা। কাল এ সময় চা খাচ্ছিলাম। এখন লিখছি। একটু পরে বেরুবো। এখানে খাওয়া, লেখা ও বেরুনো ঘটনা। এগুলো ঘটেছে বা ঘটবে কাল, এখন ও পরে। সময়ের চিরন্তন প্রবাহকে খণ্ডিত করে আমরা এরকম নাম দিয়েছি। তা হলে ঘটনা থাকে সময়ের ভেতর। গ্লাস যেমন পানি ধারণ করে, সময়ও তেমনি ঘটনার আধার। এ পর্যন্ত ঠিকই আছে। গোলটা হল, ঘটনা সময়ের মধ্যে থাকে- এর অর্থ কি এই যে, সময় বাস্তব অস্তিত্বময় কোনও সত্তা? কারণ ধারণ করতে পারা একটা ক্ষমতা, যার অস্তিত্ব নেই, তার ক্ষমতা থাকবে কী করে? বস্তু মাত্রেরই আণবিক অস্তিত্ব আছে। কিন্তু সময়ের আণবিক অস্তিত্ব আছে, এমন দাবি কেউ করে নি। তবে কি সময় অবস্তু? শুধুই ধারণা? যদি তাই হয় তবে সেই ধারণা মনে কীভাবে আসে? সময়ের ভাব কি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আসে, নাকি সময়ের ভিত্তিতে আমরা অভিজ্ঞতাকে অনুধাবন করি?

আমার আসল মুশকিল এইখানে না, আরো স্পর্শকাতর জায়গায়।তর্কটা ধর্মতাত্ত্বিক। সময় কি সৃষ্ট? যা বাস্তব, তাকে সৃষ্ট হতে হবে। যদি সময়কে অবাস্তব বলি, বিপদ। প্রমাণ করতে হবে আমি বাস করছি সময়হীনতায়, আমার বয়স বাড়ছে না, ফলে আমি মরবোও না। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই কল্পনা। অন্যদিকে যদি বলি বাস্তব তবে জানতে হবে তা সৃষ্ট না অসৃষ্ট। ভাবতে গিয়ে মনে হলো, কুয়াশায় পথ খুঁজে পাচ্ছি না। ধরা যাক সৃষ্ট। এ ধরে নেওয়া আরও কিছু ধারণাকে ধরে নিয়ে আসে: আল্লাহ এ জগৎ সৃষ্টি করেছেন কোনো এক সময়ে- কিন্তু সময়কে সৃষ্টি করেছেন কোন সময়ে? সৃষ্টি বলতে একসময় হয়তো কিছুই ছিলো না; কিন্তু সময় ছিলো না, এটা কল্পনা করা যায় না। তবে কি সময় অনাদি? কুরআনে আছে, একদিন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপর পুনর্সৃষ্টি। এ 'তারপর' একটা সময়; মানে সময় ধ্বংস হবার নয়। তাহলে কি সময় অনন্ত? সময় পৃথিবীতে আছে, বেহেশতেও আছে। এ দুয়ের বাইরেও সবখানেই আছে। সময় কোথাও সীমিত নয়। অসীম? গোল, চৌকো- এমন আকারও জানি না। তা হলে সময় নিরাকার? কিন্তু সত্তাগতভাবে তো নয়ই, গুণগতভাবেও আমরা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে বা কিছুকে শরিক বা সদৃশ মনে করি না। কাজেই সময় বলে সত্যি যদি কিছু থাকে, তো তাকে নিজের মতোই থাকতে হবে। আল্লাহর মতো নয়। আল্লাহর পরম একতায় ও অনন্যতায় কোনও মিশ্রণ গ্রাহ্য নয়। শুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস গঠনের জন্যেই সময়ের প্রকৃতি বোঝা দরকার। আল্লামা ইকবালের কথায় : "মুসলিম তামাদ্দুনের ইতিহাসে শুদ্ধ প্রজ্ঞার ও ধর্মীয় মনস্তত্ত্বের ক্ষেত্রে যে আদর্শের সাক্ষাৎ মেলে সে হচ্ছে অসীমকে পাওয়া ও উপভোগ করা। এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যে তামাদ্দুনের তাতে সময় ও কালের সমস্যা একটি জীবন-মরণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে।" আলবৎ সত্যি কথা। সময়ের আসল রূপ না বুঝে ইসলামী আকিদার অনেকখানিই ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে বিষয়টা দর্শনের আলোচ্য। আর দার্শনিকরা যে ভাষায় আলোচনা করেন তাতে আলোকপাতের চে' কুয়াশাপাতই বেশি হয়। আমরা বহু মতের ভিড় থেকে নিজের জ্ঞান অনুযায়ী সত্যের আলোকরেখা চিনে নেবার চেষ্টা করবো।

মুসলিম চিন্তাগোষ্ঠী আশারিয়ার মতে, সময় হচ্ছে প্রতিটি বর্তমান মুহূর্ত 'এখন' এর আনুক্রমিক ধারা। একটি এখন, দু'টি এখন, অসংখ্য এখন? দুটি এখনের মাঝখানে তাহলে কী আছে? সময়হীন শূন্য? অদ্ভুত! সময় আলু, নাকি মুরগির ডিম! সত্যকে বুঝতে যে প্রজ্ঞা দরকার, এ দীন সম্প্রদায়ের তা ছিলো না। ফলে সূক্ষ্মদর্শী মুতাযিলার সঙ্গে স্থূল দ্বিমত পোষণ ছাড়া ইতিহাসে এদের আর কোনো কৃতিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।
ইমানুয়েল কান্ট মনে করেন, সময় হলো সংবেদনের আকার। এটি জ্ঞাতা মনের আধার। এর বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। কিন্তু নিটশে মনে করেন, স্থান ব্যক্তিনিষ্ঠ হলেও সময় তা নয়। তাঁর মতে সময় সত্তাবান এবং একটি অসীম প্রক্রিয়া। ইমাম গাযালীর ধারণা, সময় ও কাল মূলত বিভিন্ন বস্তুর সম্পর্কবিশেষ। এ সম্পর্ক আল্লাহ-সৃষ্ট। এর জ্ঞান আল্লাহই আমাদের দিয়েছেন। তিনি দার্শনিক কান্টের সঙ্গে এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, সব ধরণের অভিজ্ঞতা লাভের পূর্বশর্ত এই স্থান ও কাল। আমরা স্থান-কাল ভিন্ন কোনো বস্তুর কিংবা কোনো বস্তু ভিন্ন স্থান-কালের কল্পনা করতে পারি না। অভিজ্ঞতা স্থান-কাল সম্ভব করে তোলে না বরং স্থান-কালই অভিজ্ঞতা লাভের প্রাথমিক উপায়।
নিউটনের মতে সময় আপেক্ষিক নয়; নিরপেক্ষ। আল্লামা ইকবালের তাতে আপত্তি। তিনি বলেন, সময়ের স্বাধীন সত্তা স্বীকার করে যদি ধরে নিই তা স্বীয় স্বরূপে সমভাবে প্রবাহমান; তাহলে আমরা বুঝতে পারি না কীভাবে কোনো বস্তুকে সময়ের স্রোতে ডুবিয়ে দিলে তার ওপর সময় ক্রিয়া করে, এবং সে বস্তুটি যাকে এমন করা হয়নি তা থেকে পৃথক হয়। সময়কে উপানুমানে বুঝতে গেলে তার আদি, অন্ত ও সীমার কোনো সন্ধান মেলে না। প্রবাহই যদি সময়ের প্রকৃতির শেষ কথা হয় তবে প্রথম প্রদত্ত সময়কে বুঝতে দ্বিতীয় একটি সময়ের প্রয়োজন এবং দ্বিতীয়টিকে বুঝতে তৃতীয় আরেকটি। এভাবে অসংখ্য সময়ের উৎপত্তি হবে। কাজেই সময়কে বিষয়ী দৃষ্টিতে বিচার করা ঠিক নয়। কারণ আমরা আণবিক সময় আল্লাহর ওপর আরোপ করতে পারি না।
ইকবাল মনে করেন, কেবল চেতন অভিজ্ঞতাতেই কালের সত্যিকার রূপ প্রস্ফূটিত হতে পারে। কাজেই কালের প্রকৃতি বুঝবার জন্যে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই শুদ্ধ পথ। তিনি সাধারণভাবে স্থান-কাল আপেক্ষিকতাবাদের সঙ্গে একমত। তিনি হোয়াইটহেডের সঙ্গেও একমত যে, গতিময় শূন্যে প্রকৃতি একটি স্থির তথ্য নয়; বরং প্রকৃতি হচ্ছে ঘটনার একটি কাঠামো। প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্রম-সৃষ্টি-প্রবাহ। স্থান-কাল আপেক্ষিক এবং বাস্তব। এ দুয়ের মধ্যে কাল অধিকতর মৌলিক। যদিও সমস্ত বস্তুর মূলে রয়েছে স্থান ও কাল, তবু এদের সম্পর্ক দেহ-মনের সম্পর্কের মতো। কাল হলো স্থানের মন। আমাদের জাগতিক এবং মানসিক অস্তিত্বের মতো 'খুদি'র আন্তরজীবনেরও দু'টি দিক আছে। কদরদানমূলক ও ক্ষমতামূলক। কদরদান খুদি শুদ্ধ কাল অর্থাৎ অনুক্রমহীন পরিবর্তনের ধারণা দেয়। ক্ষমতামূলক খুদির প্রকাশ ধারাবাহিক কালের মধ্যে। ইকবাল বার্গসঁ'র মতো বাহ্যিক ও অন্তর্জগতের নিত্য পরিবর্তনের মধ্যে অনুক্রমহীন কাল বা শুদ্ধকালের ধারণায় বিশ্বাস করেন। পরম খুদির সাক্ষাৎ মেলে এ বিশুদ্ধ কালেই।
ম্যাকটেগার্ড ও আরো কতিপয় চিন্তাবিদ শুদ্ধকাল ও ধারাবাহিক কালের পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারেন নি। সম্ভবত এ জন্যেই তাঁরা কালের সত্তা অস্বীকার করাকে সম্ভব বলেন। তাঁরা স্বীকার করেন শুধু কালের ধারাবাহিক প্রকৃতিকেই। ইকবাল বলেন, যদি আমরা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে কালের প্রয়োজনীয় অঙ্গ মনে করি, তাহলে কালকে আমরা একটা সরলরেখা বলে কল্পনা করি। এ রেখার কিয়দংশ আমরা ভ্রমণ করে পেছনে ফেলে এসেছি আর কিছু অংশ সামনে ভ্রমণের বাকি রয়ে গেছে। সময়ের এরূপ ধারণা সময়কে একটি সৃষ্টিধর্মী বৈপ্লবিক গতি না করে একে সম্পূর্ণ অনড় করে তোলে। ফলে ভবিষ্যৎ পূর্ব থেকেই নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় সত্য, পূর্ব-নির্ধারিত নয়। কাজেই সময়ের প্রকৃত রূপ যাঁরা ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন না, তাঁরাই সময়কে এমন রেখা হিসেবে কল্পনা করেন। ইকবাল বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করতে চাই যে সময়টা সত্তার মধ্যে একটি অপরিহার্য উপাদানরূপে বিরাজ করছে। কিন্তু প্রকৃত সময় ক্রমিক সময় নয় যাতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পার্থক্য অপরিহার্য। প্রকৃত সময় হচ্ছে খাঁটি বা বিশুদ্ধ সময় অর্থাৎ পর্যায় বা অনুক্রমহীন পরিবর্তন। এ কাল অতীত-ভবিষ্যৎরহিত এক অনন্ত বর্তমান। এ কাল আল্লাহর পরম গুণ -- অসৃষ্ট, অনাদি, অনন্ত, অসীম ও নিরাকার। এ কাল সম্পর্কেই হাদীসে কুদ্সীতে আল্লাহর বাণী : 'আনা দাহর', আমিই সময়।

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০০৯

ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই ধর্মহীনতা

শ্রদ্ধেয় জনাব শ্রীকান্ত পাল, আপনার দীর্ঘ ও যুক্তিপূর্ণ আলোচনাসমৃদ্ধ মেইল পেয়ে খুবই আনন্দিত হয়েছি। আমি সবসময়ই মুক্তচিন্তার পক্ষপাতী। সেই শৈশব থেকেই কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছি। সে কারণে আপনার খোলা মনে লেখা কথাগুলো আমার ভালো লেগেছে এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনার সব ক'টি প্রশ্নেরই উত্তর দেবার চেষ্টা করবো। কিন্তু ঝামেলায় পড়ে কয়েকদিন নেটের বাইরে ছিলাম। তাই দেরি হয়ে গেলো।
যাই হোক, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকতেই পারে। আশা করি আমার সীমিত জ্ঞানের মূল্যায়ন উদারতার সঙ্গে গ্রহণ করবেন! আমার আবার একটা বদভ্যেস হলো অকারণে বাক্যে বেশি জোর দিয়ে ফেলা, রূঢ় শব্দের ব্যবহার।
অনেকগুলো মূল্যবান প্রশ্ন আপনি উত্থাপন করেছেন। প্রথম প্রশ্নটি ছিলো : ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কি ধর্মহীনতা, নাকি অন্য কিছু? আমি তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের অর্থ ও প্রকৃতি নিয়ে কথা বলবো। পাশাপাশি জানতে চেষ্টা করবো, ধর্মে বিশ্বাসীরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী হতে পারে কি না ।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পশ্চাদপট
পর্ব-১
ধর্ম ও রাজনীতি সমাজের দুটি প্রধান স্তম্ভ। মানুষের কাছে ধর্ম সব সময়ই পবিত্র মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে দেশ বা রাষ্ট্র চালানোর নীতি হিসেবে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অধিকাংশ সময়ই রাজনীতির সাথে প্রতারণা বা মিথ্যাচার মিশে ছিলো। খোদায়ী ধর্মগুলোসহ কিছু কিছু মতবাদ ধর্ম ও রাজনীতিকে অবিচ্ছিন্ন এবং পরস্পরের পরিপূরক বলে মনে করে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মনে করেন ধর্ম ও রাজনৈতিক তৎপরতার ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই ধর্মকে সামাজিক অঙ্গনে বিস্তৃত না করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমিত রাখা উচিত ।
খ্রিস্টীয় ১৪শ ও ১৫শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় রাজা বা সম্রাটদের সাথে গীর্জার ব্যাপক অসহযোগিতার সময় ধর্মনিরপেক্ষতার চিন্তাধারা গড়ে ওঠে। সেক্যুলাররা খ্রিস্ট ধর্মকে রাজনীতি ও সামষ্টিক জীবন থেকে নির্বাসন দেয় এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলোকে সাধারণ আইন অনুযায়ী পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। অবশ্য সে যুগে গীর্জার যাজকরা ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মানুষের সাথে অন্যায় আচরণ করতো এবং অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতো। গীর্জার সাথে দ্বিমত পোষণ করার অপরাধে অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জন উইলিয়াম ড্রপার তাঁর 'A History of the Intellectual development of Europe' ( Vol-I) গ্রন্থে দাবি করেছেন, ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পরিচালিত তদন্ত অভিযানে ৩ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষকে শাস্তি দেয়া হয়েছিলো, এর মধ্যে ৩২ হাজার মানুষকে পুড়িয়েই মারা হয়েছিলো। কেনেথ ওয়াকার তাঁর 'Diagnosis of Man' গ্রন্থে ( প্র: ২১০) লিখেছেন, একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যাজকতন্ত্রের সাথে দ্বিমত পোষণ করার অপরাধে শুধু মাদ্রিদ শহরেরই ৩ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিলো। গীর্জা ও সম্রাটদের মধ্যকার ওই সংঘর্ষে শেষ পর্যন্ত যাজকরা পরাজিত হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পক্ষের শক্তিগুলো তাদের সর্বশক্তি দিয়ে খ্রিষ্টবাদের সমালোচনায় রত হয়। ধর্মের নামে যাজকরা তখনকার দিনে যে শাসন চালাতো তা ছিল মুলত গীর্জাতন্ত্র। যাজকতন্ত্রের জুলুম-নির্যাতনে ক্ষিপ্ত হয়ে তখনকার শাসকরা ধর্মের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলে সেগুলো হলো , ‘ ধর্ম অসহনশীলতার জন্ম দেয়। মানুষের বর্বর অতীতের ধ্বংসাবশেষ এই ধর্ম। গোঁড়ামি ও ধর্ম পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে। ধর্মযুদ্ধসমূহে মানব-রক্তের স্রোত বয়ে গেছে। ধর্মাধিকারীরা রাজনৈতিক স্বাধীনতার কণ্ঠে ছুরি চালিয়েছে। ধর্মীয় রাষ্ট্রে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার কোন স্থান নেই। ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পরের মধ্যে দা-কুড়াল সম্পর্ক এবং যে কেউ এ দুটির যে কোনো একটির সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে, এক সঙ্গে দুটির সঙ্গে নয়।‘ ( ধর্মান্ধতা বনাম ইসলাম : অধ্যাপক খুরশীদ আহমদ পৃ:-১) উপরিউক্ত সবগুলো অভিযোগ করা হয়েছিল খ্রিস্ট ধর্মের বিরুদ্ধে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ইসলামের মতো শান্তি ও সহনশীলতার ধর্মের বিরুদ্ধেও একই ধরণের অভিযোগ দাঁড় করাচ্ছে।

পর্ব-২
পাশ্চাত্যের রাজনীতি ধর্ম ও নৈতিকতাহীন হওয়ায় সেখানকার নেতৃবৃন্দ দেহসর্বস্ব এক একটি পশুতে পরিণত হয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে, ধর্মহীন রাজনীতির স্বভাবই হলো -- অতিরিক্ত লোভ-লালসা চরিতার্থ করা। মিথ্যাচার, প্রতারণা, দুর্নীতি ধর্মহীন রাজনীতির নিত্যসঙ্গী। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা অভিযোগ করে থাকেন যে, ধর্ম অসহনশীলতার জন্ম দেয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, খ্রিষ্টান চার্চের সংকীর্ণমনা নেতাদের দ্বারা ধর্মীয় অসহনশীলতা প্রদর্শিত হলেও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আবির্ভাবের পর অসহনশীলতার মাত্রা ও ভয়াবহতা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারেনি ; পারেনি শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধির গোড়াপত্তন ঘটাতে। ড: উইল ডুরান্ট তাঁর Story of Civilication গ্রন্থের চতুর্থ খন্ডে বলেছেন, ‘সিজার থেকে নেপোলিয়ন পর্যন্ত সময়কালে যতো লোক নির্যাতন ভোগ করেছে এবং যুদ্ধে যত লোক প্রাণ দিয়েছে, পশ্চিমী আধিপত্যের বর্তমান এই যুগ, তার চেয়ে অনেক বেশি নির্দোষ মানুষকে নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট করেছে এবং এ যুগের যুদ্ধ ও নির্যাতনের হিংস্রতা বন্য পশুর হিংস্রতাকেও হার মানিয়েছে। মানবেতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছে আমাদের এই যুগ।” ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা অপর ধর্মের প্রতি কতোটা সহনশীল (!) তার কিছু দৃষ্টান্ত দেখুন অধ্যাপক খুরশীদ আহমদের ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষ অসহনশীলতা প্রবন্ধে। প্রবন্ধকার লিখেছেন-- “কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রেই নয়, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই ধর্মবিরোধী উন্মত্ততা আরো বেশি পীড়াদায়ক। গ্রীসে সমগ্র মুরিয়া সম্প্রদায়ককে নির্মম মৃত্যুর শিকারে পরিণত করা হয়েছিলো। এমনকী নারী শিশু ও মহিলাদের প্রতিও সামান্য করুণা প্রদর্শন করা হয় নি। মুরিয়া সম্প্রদায়ের প্রায় তিন লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিলো। স্পেন ও সিসিলি থেকে মুসলমানদের উজাড় করা হয়েছে হত্যা ও নির্বাসনের মাধ্যমে। বাল্টিক রাষ্ট্রসমুহে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের সংখ্যালঘূতে পরিণত করা হয়েছে। আর এজন্য হত্যা, নিপীড়নসহ সবরকমের পন্থাই অনুসৃত হয়েছে। ফিলিস্তিনে বিদেশী এক সম্প্রদায়কে অন্যায়ভাবে আমদানি করা হয়েছে এবং মুসলমানদের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদ থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে বিদেশি ইহুদীদের গৃহদান করা হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে মুসলমানদের ভাগ্যে যা ঘটেছে, তাও আজ সকলের জানা। ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমে এবং ধর্মহীন রাশিয়ায় এ ব্যাপারে একই মানসিকতা বিরাজ করছে। ”ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করার পর এই যে মানসিকতার অভ্যুদয়, একে যদি সহনশীলতা বলা হয়, তাহলে অসহনশীলতা বলা হবে কাকে?

ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটির অর্থ আসলে কী?
ইংরেজি Secularism শব্দের বাংলা অনুবাদ হলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। বিশ্বের প্রধান প্রধান ডিকশনারীগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ করা হয়েছে ধর্মহীনতা কিংবা নাস্তিকতা।
ক) বিশ্বখ্যাত Random house dictionary of English language এ - Secularism এর তিনটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়েছে।
No. 1- no regarded as religious or spiritually sacred. যা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিকভাবে পবিত্র বলে বিবেচিত নয়।
No. 2- no partaining to or connected with a religion. যা কোনো ধর্মের সাথে সম্পর্কিত নয়।
No. 3- no belonging to a religious order. যা কোনো ধর্ম বিশ্বাসের অন্তর্গত নয়।
খ) Webster অভিধানে 'secular' শব্দটির অর্থ: ধর্ম বা ধর্ম-বিশ্বাস বর্জন বা এই বিষয়ে উদাসীন থাকা।
গ) Short Oxford Dictionary-তে 'secular' শব্দটির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে : এমন একটি তত্ত্ব যার মূলনীতি হলো, নৈতিকতার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ইহজগতে মানুষের ভালো থাকা, এতে পরলোক বা ঈশ্বরে বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। এই শব্দটির সাথে ধর্মহীনতা, ইহজগৎবাদ, রাষ্ট্র-ধর্ম-পৃথকীকরণ, দৈবশক্তির পরিবর্তে মানবিক ক্ষমতায় বিশ্বাস, বি-ধর্মীকরণ ও যুক্তিবাদী বিশ্বাস ইত্যাদি ধারণার একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।
উল্লিখিত তিনটি ডিকশনারীর বক্তব্য অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা । এখন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা প্রমাণ করুন যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।
ধর্মে বিশ্বাসীরা কি ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারেন?
বর্তমান বিশ্বে যারাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী তারাই কোন না কোন ধর্মের অনুসারী। তাই মুসলমানরা তো দূরের কথা- অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীও ধর্মনিপেক্ষ হতে পারবে না। নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করার অর্থ নিজের সাথেই নিজে প্রতারণা করার শামিল। আমার এ দাবির পক্ষে বাস্তব কয়েকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করুন :
ক ) একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী যখন পরনে ধুতী, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, গায়ে নামাবলী ও পৈতা জড়িয়ে, মাথায় টিকি, সিঁথিতে সিঁদুর ও হাতে শাঁখা পরেন, বারো মাসে তেরো পূজা এবং তেত্রিশ কোটি দেবতায় বিশ্বাস করে প্রত্যহ মন্দিরে গিয়ে দেবতার পদপ্রান্তে অর্ঘ-নৈবেদ্য নিবেদন করেন, তখন কি তার পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ থাকা সম্ভব? তিনি তো ধর্মের পক্ষেই চলে গেলেন।
খ) একজন মুসলিম পুরুষ যখন মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি এবং লম্বা জামা পরেন, নামায-রোযা, হজ্জ ও উমরাহ পালন করেন, মুসলিম নারী যখন শালীন পোশাক তথা হিজাব পরেন, আল্লাহ-রাসূল, কুরআন-হাদীস, পরকাল, জান্নাত-জাহান্নামে বিশ্বাস করেন, তিনিও তো ধর্মের পক্ষেই অবস্থান নিলেন।
গ) একজন শিখ যখন গুরু নানকের অনুসারী হয়ে দাড়ি না কেটে মাথায় পাগড়ী পরেন এবং হাতে বালা ও কৃপাণ ধারণ করেন, গুরুদুয়ারায় গিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন তখন তো তিনি ধর্মের পক্ষেই থাকলেন।
ঘ) একজন বৌদ্ধ যখন গৌতম বুদ্ধের ‘অহিংসা পরমধর্ম’ ও ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে গেরুয়া বসন পরিধান করে আত্মার মহানির্বাণ লাভের জন্যে কৃচ্ছ্র-সাধন করেন, বোধিবৃক্ষকে পবিত্র জ্ঞান করে প্যাগোডায় যান তিনিও তো ধর্মের পক্ষই অবলম্বন করলেন।
ঙ) একজন খৃস্টান যখন যিশুখৃস্টকে তাদের ত্রাণকর্তা প্রভু বলে বিশ্বাস করেন, গলায় ক্রুশ ঝুলান, ত্রিত্ববাদ ও বাইবেলে বিশ্বাস করেন, মুখে যিশুর নাম উচ্চারণ করে প্রতি রোববার গির্জায় প্রার্থনা করেন, আমেরিকার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট যখন বাইবেল স্পর্শ করে প্রেসিডেন্টের শপথ নেন এবং তাদের প্রতিটি ডলারে যখন ছাপার অক্ষরে লেখা থাকে 'IN GOD WE TRUST' তখন তারাও তো আর ধর্মনিরপেক্ষ থাকলেন না, ধর্মের পক্ষেই এলেন।এটাই যখন প্রকৃত বাস্তবতা, তখন কতিপয় নাস্তিক ছাড়া আর ধর্মনিরপেক্ষ রইলো কারা? প্রকৃত বিষয় হচ্ছে ধর্মে বিশ্বাসী কোনো মানুষই ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না।
-----------------------------------------------------------------------
সংযোজনী : এ লেখাটি আমার ব্লগেও প্রকাশিত ও গত ৫ ঘন্টায় ২০৩২ বার পঠিত। প্রাসঙ্গিক মনে করে কয়েকটি পাঠপ্রতিক্রিয়াও সন্নিবেশিত হলো।
হাইড্রো-এক্স :ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মের জন্য প্রযোজ্য। ইসলাম নামক জীবন-ব্যবস্হার জন্য প্রযোজ্য নয়। এখন আলোচনা করা উচিত আসলেই কি ইসলাম একটি ডিভাইন জীবন-ব্যবস্হা? যদি আসলেই এটি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে আসে তবে স্রষ্টা অবশ্যই তা শ্রেষ্ঠ ও জীবনের সকল সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম। কিন্তু যদি তা না হয় তবে বাদ।

লেখক :দুঃখজনকভাবে ইসলামকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বাইরে গণ্য করা হচ্ছে না এই কারণে যে, মানুষ ভুল করে ইসলামকেও স্রেফ একটি ধর্ম মনে করে।এ বিষয়ে একটা কিছু লিখুন যে কী কারণে ইসলামকে ধর্মের সীমিত সংজ্ঞার ভেতরে বেঁধে রাখা যাবে না। ধন্যবাদ!

ফারুক : আর যদি কেউ সকল একেশ্বরবাদী ধর্মে বিশ্বাস করে , তাকে কি বলবেন? যেমন আমি হিন্দু , খৃষ্টান , ইহুদী , মুসলিম ও আরো যত একেশৃরবাদী ধর্ম আছে , সবেতেই বিশ্বাস করি।লেখক : তাহলে আপনি আমার আক্রমণের বাইরে থাকায় বেঁচে গেলেন। কারণ আপনি "একেশ্বরবাদ" নামক ধর্মের পক্ষে, নিরপেক্ষ নন। ধন্যবাদ!সক্রেটিসও একেশ্বরবাদী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথও। তবে এই বিশ্বাসে একটা শূন্যতা থেকেই যায়। রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ কবিতা, যা তিনি মুখে মুখে বলে গিয়েছিলেন : "তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করিবিচিত্র ছলনাজালে, হে ছলনাময়ী!..."

জনৈক বাঙাল : তো? এখন কী করতে হবে?

লেখক : চিন্তা।

কাঠমোল্লা : প্রাইভেট মেলের জবাব এখানে কেন বুঝলাম না।
ইংরেজী ডিকশনারী ঘেঁটে ধর্মনিরপেক্ষতার সজ্ঞার যে ফিরিস্তি দিয়েছেন দেলোয়ার হোসেন সাঈদী একই ভাবে তা দিয়ে থাকে। আপনি আশা করি সাঈদীর তুলনায় বেশী শিক্ষিত এবং ইংরেজী অভিধানের বাইরেও পড়াশুনার ক্ষমতা রাখেন। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রেক্ষাপট পাশ্চাত্যে আর উপমহাদেশে এক না, এবং সেকারণে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাও এক না। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা এখানে স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হয়েছে। এ অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্তৃক বার বার সংখ্যালঘু নির্যাতিত হয়েছে। এমনকি একই ধর্মের বড় বা ক্ষমতাধর সম্প্রদায় দুর্বলতরদের দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। রাজনীতির সাথে ধর্ম মিশিয়ে বহু অনাচার হয়েছে, বহু রক্ত ঝরেছে, ভিটে-মাটি ছেড়ে দেশান্তরী হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। একারণেই কোন ধর্মগোষ্ঠিকে একক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব না দিয়ে সব ধর্মকে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমান রাখাই ধর্মনিরপেক্ষতার স্থানীয় ধারণা। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ব্রাহ্মণ, শুদ্র, ক্যাথোলিক, ব্যাপ্টিস্ট, হীনযান, মহাযান, শিয়া, সালাফি, আশেকে রাসুল, কাদিয়ানী, নাস্তিক সবার ধর্মচর্চা করার বা না করার অধিকার সমান এবং রাষ্ট্র কোন নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হবে না। ব্যক্তি পর্যায়ে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হল কোন ধর্মাবলম্বীর প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ, বিরূপ মনোভাব পোষণ না করা। কাজেই ধর্মচর্চা করেও ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া যায়। উদাহরণঃ মাওলানা আজাদ, খান আব্দুল গাফফার খান, শেখ মুজিব।

লেখক : বর্তমান সময়ের সঙ্গে প্রাইভেট মেইলের বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।আপনার বক্তব্য, 'কোন ধর্মগোষ্ঠিকে একক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব না দিয়ে সব ধর্মকে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমান রাখাই ধর্মনিরপেক্ষতার স্থানীয় ধারণা' বাক্যটির "ধর্মগোষ্ঠির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব" অস্পষ্ট। বাংলাদেশে ধর্মীয় গোষ্ঠিগুলো ধর্মীয় ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক দলসমূহ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই বিচরণ করে থাকে। তাই বর্তমান সরকারও জামাত-মজলিসকে রাজনৈতিক দল হিসেবেই নিবন্ধিত করেছে, ধর্মীয় গোষ্ঠি হিসেবে নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই কোনো "ধর্মীয় গোষ্ঠির একক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব" ছিলো না।সবশেষে যে যুক্তি দিয়েছেন সে জন্যে পরমতসহিষ্ণুতা শব্দটাই ব্যবহৃত হওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। মাওলানা আজাদ কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন বলেই তিনি ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে গিয়েছিলেন, এমন ঢালাও মন্তব্য সমীচীন নয়। তিনি বড় মাপের একজন লেখকও, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে একটি বাক্যও লিখেন নি। তিনি আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, যেমনটি আমি কিংবা আপনি বিশ্বাস করি।দীর্ঘ মন্তব্যের জন্যে আন্তরিক ধন্যবাদ!

তামীম : সবশেষে যে যুক্তি দিয়েছেন সে জন্যে পরমতসহিষ্ণুতা শব্দটাই ব্যবহৃত হওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত।গরীব মানুষ : আবাল, এই সব সাঈদী কইছে ! চাইলে ভিডিও'র লিংক দিমুনে! আর হ , ধর্ম নিরপেক্ষতা আপনি যেই স্কেলে মাপছেন সেই স্কেলে আমরা মাপিনা, আপনার ইসলাম ও মানেনা, ইসলাম বুঝুন আগে, জিজিয়া কর কেনো ইসলামে বৈধ? এবং বিধর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব ও জিজিয়া করের জন্য ইসলামের উপর বর্তায়। ইসলামই ধর্ম নিরপেক্ষ আচরনকে উৎসাহিত করে , সেখানে আপনি নিয়ে এসেছেন কিছু আবাল প্রশ্ন। আরো পড়ুন, এই সব জ্ঞান দিয়ে আপনি এই জিনিস কে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। কে কোন নীতিতে বিশ্বাস করলো সেটা বড় কিছু নয়, যেখানে ধর্ম নিজেই এক আবালচোদ জিনিস, সেখানে কেঊ একেশ্বর বাদ বিশ্বাস করলেই সে মহান এবং একেশ্বরবাদ বৈধ হয়ে গেলো এমন ধারনা আপনি করতে পারেন আমরা করিনা। আর হ্যাঁ ধর্ম নিরপেক্ষতা রাষ্ট্র শাসনের জন্য এসেছে , যেখানে দেশের সকল নাগরিক একই রকম মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকবে , এবং ধর্মীয় বিশ্বাস সেখানেঅদধিকার হরনের কারন হতে পারেনা। আমাদের দেশের জাতীয় সংবিধানে এই জিনিস আছে।
২৮। (১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। আপনি আনছেন ডিকশনারী! আওয়ামীলীগ নিজে নয় এই দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঐ সংবিধানের উপর। আরো পড়ুন।

লেখক : আপনি অনেক স্ববিরোধী কথা বলে ফেলেছেন। টেনে এনেছেন অপ্রাসঙ্গিক জিজিয়া তর্ক। একেশ্বরবাদ সম্পর্কে আমার মন্তব্যের শেষ অংশটা পড়ুন।আর মনে রাখুন, সংবিধানের ওপর দেশ তৈরি হয় না, দেশের ওপর সংবিধান তৈরি হয়! ভালো থাকুন, প্রাসঙ্গিক থাকুন!কাঠ মোল্লা : ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা অপর ধর্মের প্রতি কতোটা সহনশীল (!) ।।। গ্রীসে সমগ্র মুরিয়া সম্প্রদায়ককে নির্মম মৃত্যুর শিকারে পরিণত করা হয়েছিলো। ।।। স্পেন ও সিসিলি থেকে মুসলমানদের উজাড় করা হয়েছে হত্যা ও নির্বাসনের মাধ্যমে। বাল্টিক রাষ্ট্রসমুহে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের সংখ্যালঘূতে পরিণত করা হয়েছে।
এগুলি কবে হয়েছে? কোন ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের আমলে? স্পেন বা গ্রীস এখনো ধর্মনিরপেক্ষ কিনা জানা নাই আমার। ফিলিস্তিনে বিদেশী এক সম্প্রদায়কে অন্যায়ভাবে আমদানি করা হয়েছে এবং মুসলমানদের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদ থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে বিদেশি ইহুদীদের গৃহদান করা হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে মুসলমানদের ভাগ্যে যা ঘটেছে, তাও আজ সকলের জানা। ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমে এবং ধর্মহীন রাশিয়ায় এ ব্যাপারে একই মানসিকতা বিরাজ করছে। ”
ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করার পর এই যে মানসিকতার অভ্যুদয়, একে যদি সহনশীলতা বলা হয়, তাহলে অসহনশীলতা বলা হবে কাকে?ইজরায়েল কট্টর ধর্মতান্ত্রিক দেশ, ধর্মনিরপক্ষতার কোন লেশ নেই সেখানে। সোভিয়েট ইউনিয়ন আপনিই বলছেন ধর্মহীন ছিল, ধর্মনিরপেক্ষ না। সেখানে মুসলমানদের যা ঘটেছে, অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও তা ঘটেছে। সকল ধর্মকে অবদমন করা সেখানকার রাজনীতির অংশ ছিল। অর্থাৎ ধর্ম ও রাজনীতি পৃথক ছিল না।

লেখক : "ইজরায়েল কট্টর ধর্মতান্ত্রিক দেশ, ধর্মনিরপক্ষতার কোন লেশ নেই সেখানে। সোভিয়েট ইউনিয়ন আপনিই বলছেন ধর্মহীন ছিল, ধর্মনিরপেক্ষ না। সেখানে মুসলমানদের যা ঘটেছে, অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও তা ঘটেছে। সকল ধর্মকে অবদমন করা সেখানকার রাজনীতির অংশ ছিল। "আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে "এগুলি কবে হয়েছে? কোন ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের আমলে? " সেই ফিরিস্তি দিতে হলে নতুন আরেকটি নিবন্ধ লিখতে হয়, মন্তব্য কলামে এতো বয়ান কী করে দিই!আমি বুঝতে পারছি যে আপনি খুব জ্ঞানী লোক। ধন্যবাদ!

এরশাদ শিকদার : ধর্মনিরপেক্ষতা কি তা বুঝতে ডিক্সনারির খুব প্রয়ো্যন?এটা ঠিক যে কেউ ধর্মে বিশ্বাসী হলে তাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলা যায় না। তবে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তার মাথা পুরো নষ্ট না হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন ধর্মে বিশ্বাসী হলেও তিনি শুধুমাত্র নিজের ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মবিশ্বাস প্রসুত নানান কালাকানুন যেগুলি অন্য বিশ্বাসের বা ধর্মে অবিশ্বাসীদের কাছে গ্রহনযোগ্য নয় সেগুলি চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করবেন না। এভাবেই তিনি একই সাথে ধর্মে বিশ্বাসী ও ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারেন। ধর্ম মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য নয়। যারা নিজের পরিচয় ধর্মের ভিত্তিতে বের করার চেষ্টা করেন তাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আছে। তারাই সব কিছুতে ধর্ম নিয়ে টানাটানি করেন।অত ধর্মের ভিত্তিতে সমাজ দেশ চালাতে গেলে দেখা যাবে পৃথিবীতে এক এক দেশ এক এক ধর্মওয়ালারা কোথাও বা নাস্তিকেরা চালাচ্ছে। ধর্ম পরিচয় এত গুরুত্ত্বপূর্ণ হলে অন্য ধর্মাবলম্বী দেশের বা মানুষের থেকেও কোন অনুদান, সুযোগ সুবিধা নেওয়া নৈতিকভাবে উচিত নয়। কাফের নাসারাদের দেশে আমাদের লোকদের যাওয়া বন্ধ, আমেরিকা ইংল্যান্ড সহ সব বিধর্মী দেশ থেকে আমাদের মোসলমান ভাইদের দেশে ফিরে আসা উচিত। শুধু তাই না, দেশের ভেতরেও একই নিয়মে চলা উচিত। ধর্মনিরপেক্ষ যখন আমরা হতেই পারব না তখন আর কাফের নাসারাদের আবিষ্কৃত নিত্য জীবনের বৈজ্ঞানিক সব আবিষ্কারও বর্জন করে আমাদের উচিত শুধু মুসলিম আবিষ্কৃত দ্রব্যাদি ব্যাবহার করা।তাতেও শেষ হবে না, এর পর শুরু হবে ধর্মপ্রচারের মহান স্বার্থে অন্যের দেশ দখল ও রক্তারক্তি মারামারি। অবশ্য কোন সন্দেহ নেই কিছু মানুষ সেটাই চান। ভাগ্য ভাল যে পাশাত্যের মানুষে এমন সবকিছু ধর্মের ভিত্তিতে চালাতে চান না, ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক করেছে তারা বহু আগেই। তাই লক্ষ লক্ষ মোসলমান সেসব দেশে সমানাধিকার নিয়ে থাকতে পারেন। সেখানে যার ইচ্ছে গির্জায় যায়, যার ইচ্ছে মসজিদে যায়, কেউ কোথাওই যায় না, কেউ কারো ধার ধারে না। হিন্দু মোসলমান, মোসলমান ইহুদী দিব্যি মিলে মিশে থাকে।

লেখক : "এটা ঠিক যে কেউ ধর্মে বিশ্বাসী হলে তাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলা যায় না। তবে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তার মাথা পুরো নষ্ট না হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন ধর্মে বিশ্বাসী হলেও তিনি শুধুমাত্র নিজের ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মবিশ্বাস প্রসুত নানান কালাকানুন যেগুলি অন্য বিশ্বাসের বা ধর্মে অবিশ্বাসীদের কাছে গ্রহনযোগ্য নয় সেগুলি চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করবেন না। এভাবেই তিনি একই সাথে ধর্মে বিশ্বাসী ও ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারেন।"
আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে একই সঙ্গে ধার্মিক ও ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া কীভাবে সম্ভব সেটি ব্যাখ্যা করেন নি। আমার আলোচনা মূলত শব্দতাত্ত্বিক, সে জন্যেই ডিকশনারির দ্বারস্থ হওয়া। ইসলাম অপরাপর সকল ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়, তবে আনুগত্য করতে দেয় না। এই যে, একই সঙ্গে পরস্পরবিরোধী দুটি জিনিসের একত্র সমাবেশ.... ব্যাখ্যা করুন, আপনি হয়তো চোর অথবা সৎ, যে কোনো একটি হতে পারেন, কিন্তু একই সময়ে একই ব্যক্তির একই বিষয়ে যুগপৎ বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী হওয়া সম্ভব নয়!

হোরাস্ : প্রকৃত বিষয় হচ্ছে ধর্মে বিশ্বাসী কোনো মানুষই ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না।নিরপেক্ষ যদি হতে না পারে, তার মানে দাড়ায় তাকে তাইলে সাম্প্রদায়িক হতে হবে। আপনি বলতে চাইছেন সব ধর্ম বিশ্বাসীরা সাম্প্রদায়ীক। আবার সাম্প্রদায়ীকের সংঙ্গা বলতে বলবেন না। হাতে ধরে সব কিছু শিখানোর টাইম নাই।

লেখক : নিরপেক্ষ শব্দটা মানুষের ক্ষেত্রে উদ্ভট। যন্ত্র নিরপেক্ষ হতে পারে, মানুষ পারে না। কারণ ভালো ও মন্দ, ন্যায় ও অন্যায় নিয়ে সে চিন্তা করতে পারে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারে।আপনি ধর্মকে হয়তো বিশ্বাস করবেন, অথবা অবিশ্বাস করবেন, কিংবা সন্দেহ করবেন -- কিন্তু কিছুতেই এ তিনটির বাইরে যেতে পারবেন না। এখন নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন আপনি ধর্মের পক্ষে, নাকি অধর্মের পক্ষে।

তামীম : আমার মতে একজন ধার্মিক লোক তার আচার ব্যবহারে পরমতসহিষ্ণু হতে পারে। কিন্তু তার ধর্মীয় কার্যকলাপে তার নিজের ধর্মের প্রতি বায়াসনেস প্রকাশ করে।আর একজন নাস্তিক কোন ধর্মের এগেইন্সটে না গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ থাকতে পারে।আপনার সুন্দর বিশ্লেষন ভাল লাগল।

লেখক : নাস্তিক্যও আরেকটা ধর্ম। এটা সৈয়দ আলী আহসান তাঁর "যখন সময় এল" বইয়ে খুব সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন। কাজেই কেউ নিরপেক্ষ নয়। ধন্যবাদ!

বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০০৯

বিশ্বায়ন আসলে কী

আমরা বুঝতে পারছি সময়ের প্রবাহ আর তার দ্রুত পরিবর্তনশীলতা, দূরত্ব ক্রমেই ঘুচছে, এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে পৃথিবী। কিন্তু 'বিশ্বায়ন' -- চমৎকার এই শব্দটিকে মতবাদ হিসেবে প্রচার করছে কারা?

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি মূলত ধনী আর শোষক দেশগুলোর দরিদ্র দেশের বাজার দখলের কৌশল।

সমাজতাত্ত্বিকরা মনে করছেন, এ সেই উপনিবেশের নব্য রূপ। সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস।

ধনিক-বণিকরা বুঝছেন বিশ্বায়ন হলো পণ্য আর পুঁজির অবাধ প্রবাহ।

এসবই হয়তো সত্য। কিন্তু ধারণাটাকে তত্ত্ব ভাববার যুক্তি কী, আমি তাই ভাবছি। এর উৎপত্তি নিয়ে আমরা নিশ্চিত জানি যে, এটি এসেছে উন্নত দেশগুলোর মাথা থেকে, যারা মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ না করে যখন বিশ্বায়নের পক্ষে ওকালতি করে তখন সেটা করে নিতান্তই তাদের অর্থনৈতিক বিকাশকে আরো প্রসারের জন্যেই। এর পেছনে আদৌ কোনো সদিচ্ছা আছে কি-না তা নিয়ে গভীর সন্দেহ পোষণ করা যেতে পারে, যদি আমরা ম্যাক্সিকান চিন্তাবিদ ফুয়েন্তেসের দেওয়া এ তথ্যগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করি : উন্নয়নশীল দেশগুলোর মৌলিক শিক্ষা-চাহিদা পূরণের জন্য ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারই যথেষ্ট, অন্যদিকে কেবল আমেরিকাতেই সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় প্রসাধন সামগ্রীর পেছনে। এটা কী করে মেনে নেওয়া সম্ভব?

আজকের পৃথিবীতে, গরিব দেশগুলোর খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং পানি সমস্যা সমাধানের জন্যে তেরো বিলিয়ন মার্কিন ডলারই যথেষ্ট। অন্যদিকে কেবল ইউরোপে সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় আইসক্রিমের পেছনে। এও কি গ্রহণযোগ্য?ইউনেস্কোর সাবেক মহাপরিচালক ফেদেরিকো মাইয়র এবং বিশ্বব্যাংকের (সাবেক) পরিচালক জেমস উলফেনসনের বলেছিলেন, ‘এটা মেনে নেওয়া অসম্ভব, যে পৃথিবী অস্ত্রের পেছনে বছরে আনুমানিক ৮০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে সে কি-না প্রতিটি শিশুকে স্কুলে শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজনীয় ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার জোগাড় করতে পারে না।’ বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতে ব্যয়ের মাত্র এক শতাংশ অর্থ দিয়ে পৃথিবীর প্রত্যেক শিশুকে ব্লাকবোর্ডের সামনে দাঁড় করানো সম্ভব।

আমি বিশ্বায়ন নিয়ে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাচ্ছি। এর সংজ্ঞা কীভাবে দেয়া যেতে পারে, বিশ্বায়নের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াগুলো কী, এইসব। বর্তমান পৃথিবীর তুমুল আলোচিত তর্কটা নিয়ে ব্লগে আলোচনা হওয়া উচিৎ।

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০০৯

ভালো চাকর তৈরির শিক্ষা

আমাদের স্বপ্নের স্বদেশ আটত্রিশ যাপন করছে। চাওয়া-পাওয়ার ফারাক সত্ত্বেও অর্জনটা নেহাত কম নয়। আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি, বিশ্বসভায় পেয়েছি সম্মানের আসন। এই এতোদিনে তৃতীয় বিশ্বের কাতার থেকেও উৎরে যেতে পারতাম। ভালোমতোই সম্ভব ছিলো সেটি, নিজেদের যা আছে তা দিয়েই। বিপুল জনশক্তি, উর্বর মাটি, মাটির তলায় অঢেল সম্পদ। সব বাদ দিয়ে পানির কথাই ধরুন, এতো মিঠে পানি পৃথিবীর কোথাও নেই। শুধু এ পানি প্রক্রিয়াজাত করে সারা দুনিয়ায় রপ্তানি করা যায়। কিন্তু নিজের সম্পদ আমরা নিজেরা কাজে লাগাতে পারি না, মেধা বাইরে পাচার করে দিয়ে তেল-গ্যাস তুলবার জন্যে নাইকো-ফাইকো কতো কাকে ডাকাডাকি! সাহিত্যে সঙ্গীতে দুনিয়াকে দান করবার মতো সমৃদ্ধি আমরা অর্জন করেছি; কিন্তু পিছিয়ে আছি অর্থ ও প্রযুক্তিতে। আরো একটা খুব স্পর্শকাতর জায়গা আছে, যেখানে আমরা কেবলই খাদে গড়িয়ে পড়ছি _ মূল্যবোধ। এখানে আমরা মানে প্রধানত আমাদের নেতারা। এঁদের সকল ভালোবাসার কেন্দ্রে আছে টাকা, দেশ নয়। নীতিবোধের পরোয়া করবার দায় বোধ করেন না। ফলে, আমরা যে এখনো তৃতীয় শ্রেণীতে, তার দায়ও এঁরা এড়াতে পারেন না।

আমার এক বন্ধু সেদিন এক পয়সাওয়ালাকে ধরে এনে মানপত্র দিলো। প্রশংসার তোড়ে ভাসিয়ে লোকটাকে প্রায় মহাপুরুষ বানিয়ে ফেললো। ধান্দা, সংগঠনের জন্যে কমপিউটার খসানো। আমাকে বললো, রাজনীতিটা বুঝতে পারছিস? বুঝলাম, এখানে রাজনীতি মানে চাতুরি। গ্রামে পলিটিক্স বললে লোকে বোঝে প্রতারণা। সাহিত্য, সংস্কৃতি আর মননশীলতার চর্চা যাঁরা করেন, রাজনীতিতে জড়াতে তাঁদের রুচিতে বাধে। নীতিহীন রাজনীতিকরা শব্দটাকে পঁচিয়ে ফেলেছেন। কিছুদিন পরে হয়তো বাংলা অভিধানে যুক্ত হবে: রাজনীতি_ (ব্যঙ্গার্থে) চাতুর্য।

এটি স্পষ্ট যে দেশের মানুষ দুর্বৃত্ত নেতাদের চিনে ফেলেছে। ঠেকে সমীহ করে, বিশ্বাস করে না। ভোট দেয়, দিতেই হবে, যতোদিন না ভালো বিকল্প তৈরি হচ্ছে। গরিষ্ঠ জনসংখ্যার দেশে সবাই যেখানে কর দিচ্ছে, লুটপাটের পরও কিছু উদ্বৃত্ত থেকেই যায়, তা দিয়ে পথঘাট হয়। এভাবেই স্বাধনিতার পর থেকে তিল তিল করে দাঁড়িয়েছে একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই কমবেশি কাজ হয়েছে। কিন্তু একটি খাত একদম বাদ পড়ে গেছে, সবচে' জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ যাতে মৌলিক পরিবর্তনের কোনো ছোঁয়াই লাগে নি _ সে হলো শিক্ষা।

এ যাবত একে একে পাঁচটি শিক্ষা সংস্কার ও সুপারিশমালা প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়েছে : ১৯৭২, ১৯৮৮, ১৯৯৭, ২০০২ ও ২০০৩-এ। প্রত্যেকটি কমিটিই গবেষণা এবং বিভিন্ন দেশের পাঠক্রম ও শিক্ষাপদ্ধতি নিরীক্ষণ করতে গিয়ে খরচ করেছে কোটি কোটি টাকা। তাতে সরকারের কোনো লাভ নিশ্চয়ই হয়েছে, তবে দেশের কোনো কল্যাণ হয় নি। একটি সুপারিশও কার্যকর হয় নি। কেনো হয় নি, এমনকি সে কারণও দেশবাসীকে জানানো হয় নি। হবার মধ্যে হয়েছে বিতর্ক। বিতর্কের বীজ রিপোর্টগুলোতেই পুঁতে দেয়া হয় বলে। এবারও তাই হয়েছে। নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশের শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেব খসড়া শিক্ষানীতি তৈরির জন্যে যাঁদের ডেকে পরামর্শ নিয়েছেন তাঁদের ভেতর ইসলামি নৈতিকতায় বিশ্বাসী কেউ ছিলেন না। হাজার হাজার মাদরাসা থেকে একজন প্রতিনিধিকেও তিনি দাওয়াত করেন নি। ফলে নিজের দেয়া বিশেষণ অনুযায়ী তিনি যে, 'গণমুখী, বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক ও সর্বজনীন' 'শিক্ষানীতি তৈরি করেছেন, সেটি আদৌ সর্বজনীন বলে স্বীকৃত ও কার্যকর হবে কি না, সেই সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

বক্ষমাণ শিক্ষানীতিতে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা সংকোচনের প্রতিবাদে দেশজুড়ে সভা-সেমিনার হচ্ছে। আসলে ধর্মকে উপেক্ষা করে নৈতিকতার দাবি খুবই হাস্যকর ব্যাপার। ফলে মানুষের মনে প্রশ্ন : কেমন মানুষ তৈরি করতে চায় সরকার? বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা তো অসংখ্য অভিজ্ঞ চিকিৎসক তৈরী করেছে, যাদের বিবেক নেই। অনেক প্রকৌশলী, যাদের সৃজনশীলতা নেই। বহু শিক্ষক, যাদের আদর্শ নেই। অজস্র নেতা, যাদের নীতি নেই। প্রচুর ছাত্র _ এদের জিজ্ঞেস করে দেখুন, কেনো পড়াশোনা করছো, কিছু না ভেবেই বলবে, চাকরির জন্যে। শিক্ষাবিদ তাত্তি্বকরা শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে যা-ই বলুন, বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষার্থীরা জেনে ফেলেছে যে, তারা পড়ছে চাকরির জন্যে। চাকরি তো চাকরের কাজ। সেই কাজের জন্যে দক্ষ চাকর তৈরি করতে চাইছে সরকার? কুরআন-সুন্নাহর বিশ্বমানবিক দর্শন ও সুন্দর জীবন গঠনের নীতিমালা উপেক্ষা করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে সরকার চালু করতে চায় কেবলই 'ভালো চাকর তৈরির শিক্ষা'? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট দেখেই আমি এ লেখাটির এমন রূঢ় শিরোনাম দিয়েছি। কেননা প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষানীতির ভূমিকায়ই 'শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য' অধ্যায়ে 'সেক্যুলার' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ভেবে আশ্চর্য হলাম, আমাদের মাতৃভাষায় প্রকাশিত শিক্ষানীতির প্রণেতারা এমন কী মর্ম বুঝাতে ওই বিদেশি শব্দটি প্রয়োগে বাধ্য হলেন, বাংলায় যার প্রয়োগযোগ্য শব্দ খুঁজে পেলেন না? এ কি তবে বিশেষ পরিভাষা হিসেবে প্রযুক্ত, যা মূলত একটি মানবরচিত জীবনদর্শন তথা ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেই সেক্যুলারিজম? তাহলে কি নব্বই পৃষ্ঠার দীর্ঘ খসড়া শিক্ষানীতির ভেতরে প্রবেশ করার আগেই যৌক্তিকভাবে এই খসড়া সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, উপরিউক্ত বিতর্কিত মতবাদকে ভিত্তি করে যে শিক্ষানীতি প্রণীত, তাতে আমাদের জাতীয় আদর্শ, নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কিছুতেই সম্ভব নয়?

এবার আমরা দ্বিতীয় যে খসড়া সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি তা হলো, প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি সংবিধান পরিপন্থী। কেননা এটি প্রণীত হয়েছে মূলত ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশমালার আলোকে। যে কমিশনটি ১৯৭৪ সালে তৎকালীন সংবিধান নির্দেশিত রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়। পরবর্তীকালে বারবার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসে। এখন আমাদের জাতীয় মূলনীতি হলো সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক সুবিচার অর্থে সমাজতন্ত্র। কাজেই কুদরত-ই-খুদা কমিশন প্রদত্ত সুপারিশমালা আমাদের বর্তমান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে পরিত্যক্ত, একই কারণে সেই সুপারিশমালার অনুকরণে প্রণীত বর্তমান প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিও সংবিধানসম্মত নয়। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির সুপারিশমালা পর্যালোচনা করে আমাদের তৃতীয় সিদ্ধান্ত, এ শিক্ষানীতি প্রকৃতপক্ষে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে নীতিহীন নাস্তিক্যবাদের দিকে ঠেলে দেবার সর্বনেশে পরিকল্পনা। কারণ যে দেশের মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে কথা বলতে শেখার পরই একত্ববাদের কালেমা শেখান, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্যের ধারণা দেন, সত্য কথা বলতে ও বড়দের সম্মান করতে শেখান, সেই দেশের সব ধরণের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠক্রমকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষামুক্ত করার প্রস্তাব রীতিমতো অযৌক্তিক। এমনকি মাদ্রাসাতেও অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত কুরআন, আকাঈদ, ফিকহ ইত্যাদি ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে আবশ্যিক হিসেবে না রেখে অতিরিক্ত রাখা হয়েছে। এতেই শেষ নয়, এগুলো পড়াতে হলে নাকি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। বিজ্ঞ পাঠকের কাছে বিনীত নিবেদন, সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস যে রাষ্ট্রের বুনিয়াদ, সে দেশে এমন প্রস্তাব পেশ করাকে যদি ধৃষ্টতা বলি, খুব কি অন্যায় হবে? পুরো প্রস্তাবটি দেখুন, শিশু শ্রেণী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কোথাও ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে আবশ্যিক রাখা হয় নি। প্রয়োজনের বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ললিতকলাকে। আমরা এ শিক্ষানীতির সমস্ত ধারা-উপধারা বিশ্লেষণের প্রয়োজন দেখছি না, একে সংশোধনের উপযুক্ত বলেও ধরে নিতে পারছি না, বরং স্পষ্ট ভাষায় দাবি জানাচ্ছি, এ শিক্ষানীতি অবিলম্বে বাতিল করা হোক। মনে করিয়ে দিচ্ছি, বাংলাদেশের সংবিধানের সূচনা হয়েছে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' দিয়ে। এ দেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলিম। বাকী সবাইও হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান ইত্যাদি একেকটি ধর্মে বিশ্বাসী। সেকু্যলারিজম আমাদের আদর্শ নয়। কাজেই আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি কোনো অবস্থাতেই বস্তুবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার দর্শনের ভিত্তিতে রচিত হতে পারে না। হলেও সেটি গ্রহণযোগ্য হবার কোনো কারণ নেই। শিক্ষার ওপর জাতির অস্তিত্ব নির্ভরশীল। সুতরাং নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন বুদ্ধিজীবি, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও বরেণ্য আলিমদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠন করে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে সত্যিকার অর্থেই সর্বজনীন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করুন। এটাই সবার প্রত্যাশা।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

বাংলাদেশের দৈনিক



Bangladesh Newspapers

24 Hours Bangladesh News (Dhaka) [In English]
3rdEYE (Dhaka) [In English]
Abnews24 [In Bangla]
Akti Bangladesh
AL-Ihsan (Dhaka) [In Bangla]
Amader Noakhali [In Bengali]
Amader Media [In Bengali]
Amader Shomoy (Dhaka) [In Bangla]
Bangla News [In Bangla]
Bangladesh Business News (Dhaka) [In English]
Bangladesh Business Online [In English]
The Bangladesh Observer
The Bangladesh Today [In English]
Barta Probah (Dhaka) [In Bengali]
Bd64 [In English]
BD Journalist Report (Dhaka) [In Bengali & English]
BD News Everyday (Dhaka) [In Bangla]
BD News (Dhaka) [In Bengla & English]
Bdnews24.com [In Bengali & English]
Bibekbarta [in Bengali]
Blitz (Dhaka) [In English]
Chaloman Noakhali (BegumGanj, Maijdee) [In Bengali]
ChildrenVoice.com (Dhaka) [In Bangla]
Chittagong Today (Chittagong) [In Bangla]
The Daily Ajker Kagoj
The Daily Al Ihsan [In Bangla]
Daily Amadar Orthoneeti [In Bangla]
Daily Amar Desh
The Aparadhkantha (Dhaka)
Daily Bhorer Kagoj (National)
Daily Chandpur Kantha (Chandpur)
Daily Comillarkagoj (Comilla) [In Bangla]
The Daily Deshbangla
Daily Dinkal [In Bangla]
The Daily Fulki (Dhaka) [In Bangla]
Daily Inkilab (Dhaka) [In Bangla]
The Daily Inqilab (Dhaka)
The Daily Ittefaq
Daily Janakantha (Dhaka) [In Bangla]
Daily Jugantor
Daily Karatoa (Bogra) [In Bengali]
Tha Daily Khabarpatra (Dhaka) [In Bangla]
The Daily Manab Zamin [In Bangla & English]
Daily Noya Diganta (Dhaka) [In Bengali]
The Daily People's View (Chittagong) [In English]
The Daily Prothom Alo [In Bengla]
The Daily Purbanchal (Khulna) [In Bengali]
The Daily Sangbad (Dhaka) [In Bangla]
The Daily Sangram (Dhaka)
Daily Songbad Potro (Dhaka) [In Bangla]
The Daily Star [In English]
Dainik Arthoniteer Kagoj (Dhaka)
Dainik Azadi (Chittagong) [In Bangla]
Dainik Destiny (Dhaka)
Desher Khobor (Dhaka) [In Bangla]
Dhaka Courier
Dhaka News24 [In Bangla]
Digital Bangladesh [In Bengali & English]
E-Bangladesh [In English]
The Editor [In Bangla & English]
Energy Bangla [In English]
ENB News (Dhaka) [In Bangla]
ENS (Dhaka) [In Bangali]
E-Prothom Alo [In Bangla]
The Financial Express (Dhaka) [In English]
The Good Morning (Dhaka) [In English]
Greater Noakhali (Noakhali,Feni,Lakshmipur) [In Bengali]
Hazarikaonline (Magura) [In Bengali]
The Independent (Dhaka) [In English]
Indepth News of Bangladesh [In Bangla]
Jai Jai Din
Janakantha
Kaladan News (Burma) [In English & Burmese]
Khatian [In Bangla]
Livenews.com.bd (Dhaka) [In English]
Lok Sangbad (Noakhali) [In Bangali]
Manabzamin (Dhaka) [In Bangla]
Narinjara News (Dhaka) [English & Burmese]
Next Planet [In Bangla & English]
New Age
The New Nation [In English]
News from Bangladesh
NewsNet [In Bandla]
News Time Dhaka (Dhaka) [In English]
The News Today (Dhaka) [In English]
Noakhali Web (Feni, Lakshmipur, Noakhali) [In Bengali & English]
Noya Digonto [In Bangla]
OnlineBDNews.com (Dhaka) [In Bengail & English]
Ordi-World [In Bangla]
Parbon News (Dhaka) [In Bangali & English]
Prothom Alo
Red Times BD [In Bangali & English]
Shamokal (Dhaka, Calcutta)
Shibcharsangbad (Shibchar, Madaripur) [In Bangla]
Sheersha Kagoj (Dhaka)
Songbad Potro (Dhaka) [In Bangla]
Suprobhat Bangladesh (Chittagong) [In Bangla]
Sumonbd.com [In English]
Sylhet protidin (Sylhet)[In Bangla]
Taranga News Service (Dhaka)[In Bangla]
United News Service (Dhaka)[In Bangla]
Vanguard [In Bangla]
Weekly Amod (Comilla)
Weekly Ekota [In Bengali]

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

একজন আহমেদিনেযাদ


জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পাঁচটি ক্ষমতাধর দেশের ভেটো ক্ষমতাকে 'যুলুম' বলে ভাষণ দিলেন আহমেদিনেযাদ; সেইসব দেশের প্রতিনিধিরা তখন তাঁর বক্তৃতার বিপক্ষে 'ভেটো' দিতে যান নি, বরং কেউ কেউ চাপা ক্ষোভে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এ ভেটো ক্ষমতা কতোখানি অন্যায়, অযৌক্তিক আর নিষ্ঠুর ব্যাপার তা বুঝবার জন্যে আইনবিদ হবার দরকার নেই, কেননা দুনিয়ার চোখের সামনে মধ্যপ্রাচ্যের বুকের ওপর উড়ে এসে জুড়ে বসা ইসরাইলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্লজ্জের মতো একাধারে প্রায় চল্লিশবার এ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। তা না হলে ইসরাইল টিকতো না, সারা পৃথিবী এই পাতানো রাষ্ট্রের বিপক্ষে ছিলো উচ্চকণ্ঠ। তাতে লাভ হয় নি, সাম্রাজ্যবাদ তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাকে স্রেফ প্রতিবাদের মুখে নস্যাৎ হয়ে যেতে দিতে পারে না। ফলে টিকে যায় ইসরাইল এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্বমুসলিমের প্রাণস্পন্দন বাইতুল মুকাদ্দাসে আগুন ধরিয়ে দেয় এই দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র। পরিণামে তৈরি হয় ওআইসি, আরব দেশগুলো একত্র হয়ে বাধ্য হয় যুদ্ধ ঘোষণা করতে। কিন্তু ইঙ্গ-মার্কিন মদদে হারতে হয় আরবদের। সেই ইতিহাস স্মরণ করে অদ্যাবধি ইসরাইলের চালিয়ে যাওয়া মানবাধিকারবিরোধী অপরাধগুলি খতিয়ে দেখলে সহজেই উপলব্ধি করা যায় আজকের বিশ্বে "ইসরাইলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা উচিত" এই সাহসী উচ্চারণটির জন্যে একজন আহমেদিনেযাদের কতোটা প্রয়োজন।


গত ১২ জুনের নির্বাচনে ৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ফের জয়ী হয়েছেন মাহমূদ আহমেদিনেযাদ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মীর হুসেইন মুসাভি পেয়েছেন ৩৫ শতাংশ ভোট। ইরানের আশির দশকের দীর্ঘ সময়কার প্রধানমন্ত্রী মুসাভির জনপ্রিয়তার তুলনায় তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার স্বাভাবিকের চেয়ে কম মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারচুপির অভিযোগে ঘোষিত ফল বাতিলের দাবি উঠেছে। অপপ্রচার ও অতিপ্রচারের দায়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অনলাইনে দেখা গেছে 'আমার ভোট কোথায়' ইত্যাদি লেখা প্ল্যাকার্ড ও বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিও চিত্রের ব্যাপক ছড়াছড়ি। তবু ধরে নিয়েছিলাম এসবই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচনোত্তর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। আমার নিজের দেশেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করে স্থূল কারচুপির অভিযোগ ওঠে। তার ওপর ইরানে আন্তর্জাতিক কোনো পর্যবেক্ষক ছিলেন না। ফলে নির্বাচন কতোটা সুষ্ঠু হয়েছে তা বাইরের কারো পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যা সম্ভব তা হলো একজন সৎ, কঠোর আদর্শবাদী ও অসম সাহসী দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে আহমেদিনেযাদের বিজয় সম্পর্কে আশাবাদী হওয়া।


কিন্তু গত রোববারের একটি ঘটনার খবর পড়তে গিয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ আটকে গেলো। রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম। বিক্ষোভ মিছিল থেকে আটজন ইরানস্থ ব্রিটেন দূতাবাসের কর্মকর্তা আটক হয়েছে। অথচ বিক্ষোভে ইরানী কর্তৃপক্ষের পশ্চিমা উস্কানীর দাবিকে ওবামা-মার্কেল-ব্রাউনরা বরাবর অস্বীকার করে আসছিলেন। যদিও তাঁদের বিবৃতিগুলো উল্টো সাক্ষ্য দেয়। ২১ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের বললেন, ইরানী জনগণকে তিনি জানাতে চান যে ইরানের পরিস্থিতি তাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এ আন্দোলনে ইরানী জনগণ একা নয়। এই 'একা নয়' কথাটি তাৎপর্যপূর্ণ, বিক্ষোভে পশ্চিমা ইন্ধন ফাঁস হবার পর আমরা বুঝতে পারছি যে ওবামা আক্ষরিক অর্থেই সত্য বলেছেন। কেননা দাঙ্গার পেছনে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর দূতাবাসের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও প্রচারমাধ্যমের অতি-আগ্রহ ও পক্ষপাতমূলক অপপ্রচার বেশ নগ্নভাবেই চোখে পড়ছে। যুক্তরাজ্যের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দায়ী করে ইরান সরকার বলেছে, এর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমগুলোয় মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। ২১ জুন ইরান থেকে বহিষ্কার করা হয় বিবিসির সংবাদদাতা জন লাইনকে। একই অভিযোগে এ যাবৎ ২৩ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। উদ্বেগের ব্যাপার বৈকী!


আরো একটি ব্যাপার রহস্যময়। নির্বাচনের ফল নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলেও প্রথমদিকটায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে নি এবং তার ততোটা আশংকাও ছিলো না। সহিংস হত্যাকাণ্ড শুরু হলো এর তিনদিন পর। প্রতিক্রিয়ার এ অস্বাভাবিক পরিণতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে নেপথ্যের চক্রান্তকারীরা জনগণকে প্ররোচিত করতেই এ সময় নিয়েছে কি না।


বিশ্ব-অর্থনীতির এক প্রধান প্রভাবক খনিজসম্পদসমৃদ্ধ ইরান বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদের সবচে' বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত একরোখা আহমেদিনেযাদ পরাশক্তিগুলোর সকল অবরোধের হুমকিকে সমানে আঙুল দেখিয়ে চলেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের আত্মবিক্রীত একনায়কদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা রক্ষা ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একলাই লড়ে যাচ্ছেন অবিচল। ওরা বিলক্ষণ ঠাহর করতে পারছে যে ইরানের পরমাণু শক্তিধর হয়ে ওঠার অর্থ হলো বিশ্বব্যবস্থার মোড় ঘুরে যাওয়া, মার্কিন বিশ্বায়নের নকশা বাতিল হয়ে যাওয়া এবং মুসলিম দেশগুলোকে শোষণ ও নিয়ন্ত্রণের অবসান। কাজেই ইরানকে থামাতেই হবে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় আপাতত যুদ্ধ ঘোষণা করা না গেলেও সাম্রাজ্যবাদ যে কোনো ছুতোয় অস্থিতিশীলতা তৈরি করে ইরানে একজন তাবেদার শাসককে ক্ষমতায় বসাতে চায়। ১৯৭৯-র ইসলামী বিপ্লবের আগে দেশটি যেভাবে তিরিশ বছর ধরে সিআইএ ও মোসাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো, সেই সময়কে তারা ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু হতাশার ব্যাপার হলো, ইরানে এখন আর কোনো রেজা শাহ পাহলভী খুঁজে পাওয়া যাবে না। আজ মন্দের ভালো হিসেবে মীর হুসেইন মুসাভিকে তারা মিত্র মনে করছে, অথচ এই ব্যক্তিটিই তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় হিযবুল্লাহ ও হামাসের শক্তিবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত মুসাভি ক্ষমতাশীন হলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের তুলনামূলক ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হবার সম্ভাবনা ছিলো।


এবারের নির্বাচনোত্তর সহিংসতা ইরানের ইতিহাসে প্রথম। এর আরো একটি প্রচ্ছন্ন কারণের দিকে আমি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তা হলো, মূলত শহুরে ধনিক শ্রেণীর জনগণই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কেননা নিম্নবিত্তের প্রতিনিধি কামারের ছেলে আহমেদিনেযাদ ইরানের দরিদ্র জনগণের প্রতি অতিমাত্রায় সহানুভূতিশীল। তিনি সম্পদ পুনর্বন্টন করে ইরানী জনগণের মধ্যে ধনী-দরিদ্রের ফারাক ঘুচিয়ে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন এমন আশঙ্কায় পুঁজিপতিরা ভীত হয়ে পড়েছে। আমরা লক্ষ করছি ভোট পুনর্গণনা শুরু হয়েছে এবং ক্রমেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। একজন মেরুদণ্ড টান করে দাঁড়ানো আহমেদিনেযাদের নেতৃত্বে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাক ইরান -- এটাই প্রত্যাশা।

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

সৈয়দ মুজতবা আলী : জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা


আজ ১৩ ই সেপ্টেম্বর, বাংলা সাহিত্যের এক কীর্তিমান পুরুষ সৈয়দ মুজতবা আলী'র জন্মদিন। রম্যসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর লেখার মান ছিলো খুবই উঁচুমাপের। পৃথিবীর বহু জাতি ও সংস্কৃতির ভাষা ও কৃষ্টি বিষয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মুজতবা আলীর কাছে আমরা ঋণী, এ ঋণ কখনোই শোধ হবার নয়। জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করছি আনত শ্রদ্ধায়।
সৈয়দ মুজতবা আলী : আলোকিত জীবন
১৯০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সিলেট জেলার অন্তর্গত (বর্তমানে ভারতের আসামে) করিমগঞ্জ শহরে সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, চঞ্চল ও পড়ুয়া। ১৯১৯ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট সফরে এলে সৈয়দ মুজতবা আলী কবির বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেন এবং তার ভক্ত হয়ে যান। সৈয়দ মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে পড়ালেখায় আগ্রহী ছিলেন এবং এ জন্য তিনি ১৯২১ সালে বিশ্বভারতীতে ভর্তি হন। শান্তিনিকেতনে পাঁচ বছর অধ্যয়নের পর ১৯২৬ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ওই বছরই তিনি বাংলায় লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। আলীগড়ে আইএ অধ্যয়নকালে তিনি আফগানিস্তানের শিক্ষা বিভাগে চাকরি নিয়ে কাবুল গমন করেন। অত:পর ১৯২৯ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য জার্মানিতে গমন করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৪-৪৫ সালে সৈয়দ মুজতবা আলী আনন্দবাজার পত্রিকায় কিছু দিন সাংবাদিকতা করেছেন এবং দেশ পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। ১৯৪৮ সালে সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আলোচনা সভায় পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি উর্দু ভাষার সপক্ষ শক্তির হাতে নাজেহাল হয়েছিলেন। সৈয়দ মুজতবা আলী বগুড়া আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ভারতে চলে যান এবং কিছু দিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মালানা আবুল কালাম আজাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইন্ডিয়ান ‘কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স’-এর সচিব পদে নিযুক্ত হন। অত:পর তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-এর স্টেশন ডাইরেক্টর পদে কিছু দিন চাকরি করেন এবং সেই চাকরিতেও ইস্তফা দেন ১৯৫৬ সালে। অত:পর তিনি বিশ্বভারতীতে কয়েক বছর অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। (ড. মাহফুজুর রহমান, নানা প্রসঙ্গ নানা ভাবনা, পৃ. ১৮-২৯)।
সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। জীবন নামক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, সেগুলোকেই তিনি সাহিত্যে রূপদান করেন। একাধারে তিনি ভ্রমণ-সাহিত্য রচয়িতা, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রবন্ধকার। তার ভ্রমণ-সাহিত্য হিসেবে ‘দেশে বিদেশে’, ‘জলে-ডাঙায়’, ‘ভবঘুরে’, ‘মুসাফির’, ‘বিদেশ’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার রচিত উপন্যাসগুলো হচ্ছে ‘অবিশ্বাস্য’, ‘শবনম’, ‘শহর-ইয়ার’ ও ‘তুলনাহীনা’। বিচিত্র রসের নানান গল্প তিনি লিখেছেন। কখনো হাস্যরসের গল্প, কখনো করুণ রসের গল্প, কখনো মধুর রসের মিষ্টি প্রেমের গল্প, আবার কখনো বা ভয়ঙ্কর রসের গল্প তিনি লিখেছেন। সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন লঘু নিবন্ধকার তথা রম্যপ্রবন্ধ রচনায় ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। তিনি ভ্রমণ-সাহিত্য রচয়িতা এবং রম্যরসিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
সৈয়দ মুজতবা আলী প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক নূরুর রহমান খান তার ‘মুজতবা-সাহিত্যের রূপবৈচিত্র্য ও রচনাশৈলী’ গ্রন্থে বলেছেন ‘হালকা মেজাজে আড্ডার ঢঙে বলে গেলেও মুজতবা-বচন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, শাস্ত্র চর্চা ও সার্থক বিচার-সমালোচনায় পরিপূর্ণ। তিনি বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন, বারংবার কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তন হয়েছে, বহুজনের সান্নিধ্য লাভ করেছেন পণ্ডিত, গুণী, রাজনীতিক থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত এবং এই সাধারণের প্রতি তার সহানুভূতি সমধিক। এর প্রতিফলন ঘটেছে মুজতবা আলীর প্রতিটি রচনায়। যে অসংখ্য ছোট ছোট রচনা তার খ্যাতির উৎস, সেগুলো ‘রম্যরচনা’ অভিধায় চিহ্নিত। কারণ, এগুলো পাঠকদের চিত্ত-বিনোদন ও অনাবিল আনন্দদানে সমর্থ সফল সৃষ্টি। বর্ণনভঙ্গির গুণে পাঠক অনেক সময় হাসির আবেগ সংবরণ করতে পারেন না বটে, কিন্তু আলী সাহেব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বিবিধ ভাষা ও শাস্ত্র থেকে আহৃত মনীষার ফসল এই শ্রেণীর রচনার মাধ্যমে পাঠকদের উপহার দিয়েছেন। তাই এগুলো নিছক রম্যরচনা নয়, সাবলীল ভাষায় প্রকাশিত মনোহর প্রবন্ধও বটে।’ (পূর্বকথা)।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক রম্যরচয়িতা কিংবা লঘু নিবন্ধকার হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) নাম উল্লেখ করা যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘লোকরহস্য’, ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’ ইত্যাদিতে রম্যরসের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রমথ চৌধুরীর (১৮৬৮-১৯৪৬) প্রবন্ধেও বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসের পরিচয় পাওয়া যায়।
মুজতবা আলী তার নানা লঘু নিবন্ধে রম্যরস ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন, তার রচিত ‘হিডজিভাই পি মরিস’ লেখাটির কথাই বলা যাক। ‘সেন্টিমেন্টাল এবং আদর্শবাদী’ অধ্যাপক মরিস ফরাসি পড়াতেন। তার ক্লাসে প্রবীণ অধ্যাপকগণও উপস্খিত থাকতেন। একদিন “ফরাসি ব্যাকরণের কী একটা কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলেছেন অধ্যক্ষ বিধুশেখর। মরিস সাহেব বললেন,
‘চমৎকার। শাসট্টি মশায়। সট্যি, আপনি একটা অস্টো ঘুঘু।’
শাস্ত্রী মশাইয়ের তো চক্ষুস্খির। …শুধালেন,
‘মরিস, এটা তোমাকে শেখালে কে?’
নিরীহ মরিস… বললেন, ডিনডা (দিনদা, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর)। উনি বলেছেন ওটার অর্ট ‘অসাডারণ বুডডিমান’। টবে কি ওটা ভুল।”
অধ্যাপক মরিসের বাংলা ভাষা জ্ঞান এবং অভিনব বাংলা উচ্চারণ সত্যি হাসির খোরাক জোগায়।
সৈয়দ মুজতবা আলীর এমন আরেকটি লেখা ‘অনুকরণ না হনুকরণ?’ ‘অক্ষম অনুকারী ও পেশাদার সমালোচকদের’ প্রসঙ্গে তিনি এ প্রবন্ধে ব্যঙ্গ করেছেন। বিষয়বস্তু ও ভাষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে অন্যকে যে যথাযথভাবে অনুকরণও করা যায় না তা তিনি এ প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তথাকথিত সমালোচকদের ব্যঙ্গ করেই প্রবন্ধটি রচিত। তথাকথিত সমালোচকরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সাহিত্যের সমালোচনা করেন। ফলে কমজোর লেখকও বড় লেখক হয়ে যান। এ শ্রেণীর সমালোচকরা সাধারণত ‘সর্বকর্মে নামঞ্জুর হয়ে’ অর্থ উপার্জনের প্রয়োজনে সমালোচকের ভূমিকা পালন করেন। একটি প্রচলিত চুটকির মাধ্যমে সৈয়দ মুজতবা আলী এ জাতীয় সমালোচকদের ব্যঙ্গ করেছেন। চুটকিটি হচ্ছে এক পাগল নিজেকে মহারানী ভিক্টোরিয়ার স্বামী ভাবতেন। “পাগলা সেরে গেছে এই রিপোর্ট পাওয়ার পর পাগলা-গারদের বড় ডাক্তার তাকে ডেকে পাঠিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে শুধালেন, ‘তা তুমি খালাস হওয়ার পর করবে কী?’ সুস্খ লোকের মতো বললেন, ‘মামার বড় ব্যবসা আছে, সেখানে ঢুকে যাব।’ ‘সেটা যদি না হয়?’ চিন্তা করে বললেন, ‘তা হলে আমার বিএ ডিগ্রি তো রয়েছেই, টিউশনি নেব।’ তারপর এক গাল হেসে বললেন, ‘এত ভাবছেন কেন, ডাক্তার? কিছু না হলে যেকোনো সময়ই তো আবার মহারানীর স্বামী হয়ে যেতে পারব।” এই চুটকির মাধ্যমে সৈয়দ মুজতবা আলী বুঝিয়েছেন, পাগল হওয়ার মতো তথাকথিত সমালোচকও সব সময় হওয়া যায়।
‘ইঙ্গ-ভারতীয় কথোপকথন’ প্রবন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলীর ব্রিটিশ-বৈরিতা প্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজদের যাবতীয় আচার-আচরণ অনুকরণ করা যে ভারতীয়দের জন্য স্বাস্খ্যপ্রদ নয় তা তিনি ব্যক্ত করেছেন। তৎকালীন ভারতে পর্দা প্রথা সম্পর্কে ইংরেজ সাহেবের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন লেখক চমৎকার রসিকতার মাধ্যমে। লেখকের ভাষায় “১৭৫৭ সালে তোমাদের সাথে পিরিতি সায়রে সিনান করিতে গিয়া শুধু যে আমাদের সকলি গরল ভেল তাহা নয় স্বরাজ গামচাখানা হারাইয়া ফেলিয়া দুইশত শীত বৎসর ধরিয়া আকণ্ঠ দৈন্যদুর্দশা পঙ্কে নিমগ্ন ডাঙ্গায় উঠিবার উপায় নাই। পুরুষদের তো এই অবস্খা, তাই মেয়েরা অন্দরমহলে তোমাদের ক্ষৎময় করিয়া বসিয়া আছেন।” সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখায় এভাবেই দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। দেশ-বিদেশের নানান গল্পকথা ব্যবহার করে লেখক তার বক্তব্যকে শাণিত করেছেন। তিনি একটি ইরানি উপকথা নিয়ে লিখেছিলেন ‘বিষের বিষ’ গল্পটি। গল্পটির সারাংশ হচ্ছে এক দজ্জাল স্ত্রীকে শাস্তি দেয়ার জন্য একটি গর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই গর্তের কাল-নাগিনী পর্যন্ত সেই দজ্জাল মহিলাকে দংশন করেনি নিজের প্রাণের মায়ার কারণে। গল্পের এই সারাংশটি লেখক ব্যবহার করেছেন ভিন্ন প্রেক্ষিতে সংবাদপত্রের নিবন্ধে। সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন
“কাগজে পড়লুম কোন এক প্রদেশে মন্ত্রীদের জ্যান্ত সাপের মালা পরিয়ে অভ্যর্থনা করা হয়েছিল। সাপগুলো যে কেন ওদের ছোবল মারেনি, আজ ইরানি গল্পের স্মরণে কথাটা ফর্সা হয়ে গেল।এবং বুঝতে পারলুম, ইরানি গল্পটা গল্প নয়, সত্য ঘটনা।”
মূলত সৈয়দ মুজতবা আলীর অসংখ্য লেখায় রম্যরস ছড়িয়ে আছে। রম্যরচনার পোশাকে তিনি স্বদেশ, সমাজ, মাতৃভাষা, শিক্ষা, রাজনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার মতো প্রতিভাবান লেখক বাংলা সাহিত্যে বিরল। তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

রবীন্দ্রকাব্যে কুরআনের আলো



রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না। ছিলেন উদার একেশ্বরবাদী। মূর্তিপূজা করেন নি কখনো। যাঁরা "রাজর্ষী" পড়েছেন, জানেন দেবদেবীর বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহের কথা। বাদ দিলুম রাজর্ষীর গল্প। অন্তত "বলাকা" তো পড়েছেন? বলাকার প্রথম কবিতায়ই আছে : 'শিকলদেবীর ওই যে পুজোবেদী/ চিরকাল কি রইবে খাঁড়া?/ পাগলামো! তুই আয় রে দুয়ার ভেদি...' আমি যা বলতে চাচ্ছি, ভূমিকা হিসেবে -- রবীন্দ্রনাথ প্রথাগত ধার্মিক ছিলেন না। তবু তিনি ছিলেন এক ও নিরাকার ঈশ্বরের উপাসক। এসব কথা খুবই পুরনো মনে হবে রবীন্দ্রভক্তদের কাছে, সবাই জানি। অতএব শিরোনামের বিষয়ে আসি।

প্রসঙ্গত : আমি প্রমাণ করতে চাই না যে রবীন্দ্রনাথ ইসলামী আদর্শে মুগ্ধ গদগদ হয়ে নিচে উদ্ধৃত কুরআনের অংশটুকু অনুবাদ করেছিলেন, কোনো রবীন্দ্রনাথ মুসলমান হয়ে গেলেও ইসলাম কিংবা মুসলিম জাতি বর্তে যেতো, এমন হীনমন্ম্যতা আমার নেই। হয়তো কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে। এই মিলে যাওয়ায় আমি আনন্দ পাচ্ছি এবং এ আনন্দই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি। অতএব খামাখা মৌলবাদের গন্ধ খুঁজে কেউ পণ্ডশ্রম করবেন না।

পৃথিবীর বড় বড় ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থগুলো নিয়ে রবীন্দ্রনাথ উৎসাহী ছিলেন। নিভৃতে পাঠ করেছিলেন বাইবেল, কুরআন, গীতা ইত্যাদি। নিবিষ্ট চোখে তাকালে আমরা দেখবো তাঁর গীতাঞ্জলিসহ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে পবিত্র কুরআনের অপার্থিব আবহ। বিশ্বসাহিত্যে এ ছিলো এক নতুন ভাবধারা, নোবেল সম্মাননাপত্রে যার উল্লেখ রয়েছে। ফলে ইয়েটসের মতো বহু বিশ্বখ্যাত কবি রবীন্দ্রনাথের ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন।রবীন্দ্রসাহিত্যে কুরআনের প্রভাব নিয়ে পৃথক গবেষণা হতে পারে। আমি এখানে একটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করছি, যা মহাগ্রন্থ কুরআনের সূরা ‌'ত্বা-হা'র হুবহু ভাবানুবাদ। আপনি নিজেই মিলিয়ে দেখুন। প্রথমে পড়ুন ত্বা-হা'র ২৫-২৮ আয়াতগুলো :ক্বা-লা রাব্বিশ্রাহলী সাদরী, ওয়া ইয়াস্সির লী আমরী, ওয়াহলুল উক্বদাতান মিন লিসানী, ইয়াফক্বাহু ক্বাওলী।(অনুবাদ দয়া করে মিলিয়ে নিন।)


রবীন্দ্রনাথের কাব্যানুবাদ :


প্রভু আমার হৃদয়দুয়ারখানি

এইবেলা দাও খুলে,

প্রাণের বীণায় তোমার প্রেমের বাণী

নিভৃতে দাও তুলে।

ছন্দ জাগাও পঙক্তিগুলোয়

ক্লান্তি ঝরুক পথের ধুলোয়

ভেঙে দিয়ে বন্ধ বলয়

সব পিছুটান ভুলে,

জীবনতরী লও হে আমার টানি

অরূপ তোমার কূলে।

মহাকালের পথিক



আমি হাঁটছি। পায়ের নিচে অনন্ত এক পথ। এতো মেঘ আকাশে, যেনো কয়েকটা সমুদ্র উপুড় করে ফেলা হয়েছে। মেঘ কেবলই ঘন হয়ে জমছে, তাতে অস্তায়মান সূর্যের টকটকে রং, বস্তুত এতো ভীষণ বিষন্ন লাল আমি আর দেখি নি। ফলে হাঁটার গতি দিলেম বাড়িয়ে, প্রায় ছুটছি, অন্ধকার থেকে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে অন্ধতম অনন্তের দিকে।


আমি হাঁটছি। পায়ের নিচে অনন্ত এক পথ, জন্মজন্মান্তের পদচিহ্ণ নিয়ে জলা প্রান্তর চিরে চলে গেছে একপ্রান্ত ইতিহাসরেখা। মনে হচ্ছে মাথার ভেতরে আরো এক পথ কিংবা এ পথেরই যাপিত দৈর্ঘ, কেনো এমন ভাবছি জানি না। আমি আসলে অনেক কিছুই কিংবা কোনো কিছুই জানি না। যেমন এই যে ছুটছি তার মানে কী অথবা 'ছুটছি' এ শব্দের সত্য কেননা যেতে হবে বোধটা মস্তিষ্কে কাজ করলেও নিশ্চিত নই যাচ্ছি না আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।


মাঝে মাঝে আশ্চর্য হই যখন মনে হয় বেঁচ আছি, কেননা জীবিত কেউই ছুটতে পারে বলে ভাবা হয়। কারা ভাবে? ওই যে সহস্র বছরের পানা-শেওলায় ঢাকা বিস্তীর্ণ জলাভূমি, তাতে এই ছুঁড়ে ফেললাম সমস্ত প্রশ্ন -- "জীবন আর মৃত্যু কেনো এতো অস্পষ্ট যে দু'টোতে তফাত করা যায় না" এইসব।


ঝিলটায় লাফিয়ে পড়ে আকাশ আর পৃথিবীর সমস্ত আয়োজন নস্যাৎ করে দিতে পারি, কিন্তু সেটি সঙ্গত কি না জানি না। বস্তুত আমি কিছুই জানি না কিংবা এটুকুই শুধু জানি যে আমি কিছুই জানি না। কী জানি কতো পথ সমুখে, আমি হাঁটছি।


মহাকাল, পথ আর পথিক নিয়ে কেউ একজন খেলছে। খেলাটা দেখে যাই।

শিক্ষা : লক্ষ্য অলক্ষ্যে

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রধানত তিনটি ধারা চলিত : কওমী ও আলীয়া মাদরাসা এবং স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। এ তিন রকম প্রতিষ্ঠানকেই আমি ঘনিষ্ঠভাবে জানি, গবেষক-পর্যবেক্ষকের মতো নয়, জানি শিক্ষার্থীর মতোই। কারণ সম্পূর্ণ না হলে ও এগুলোর বেশির ভাগ স্তর, আরো বিশেষ করে বললে যথাক্রমে মুতাওয়াসসিতাহ, কামিল ও সম্মান পর্যন্ত এ বিদ্যালয়গুলোকে পরিক্রম করবার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য আমার ইতোমধ্যেই হয়েছে। শিক্ষার্থী হিসেবে পরিক্রম যেমন হবার কথা, অর্থাৎ শিক্ষাতত্ত্বের নেবু চিপে রস নিঙড়ে শরবত বানিয়ে খাওয়াতে পারছি না বলে, প্রিয় পাঠক, আফওয়ান!

শিক্ষা মানুষকে কী রকমের মানুষ হতে সহায়তা করবে তার চিত্রায়নই শিক্ষার উদ্দেশ্য। শিক্ষার সাফল্য ও ব্যর্থতা বিচারের মাপকাঠি হলো তার উদ্দেশ্য, কাজেই কী রকমের মানুষ হতে সহায়তা করা শিক্ষার জন্যে সঙ্গত তা নির্ণীত হতে হবে; যদিও শিক্ষা আদৌ কোনো মৌল লক্ষ্যের জন্যে হওয়া উচিৎ কি না এ নিয়েও তর্ক আছে শিক্ষাবিদদের ভেতর, যেমন Sir Percy Nun তাঁর Education : Its data and first principle বইয়ে লিখেছেন -- শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যক্তিত্বের স্বাধীন বিকাশ; এছাড়া শিক্ষা বিশেষ কোনো লক্ষ্যের জন্যে হওয়া উচিৎ নয়। কেননা যতো ব্যক্তি ততো লক্ষ্য। তবে বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর "সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষা" গ্রন্থে তিনটি শিক্ষাদর্শনের আলোচনা করেছেন, যেগুলো সমকালীন পৃথিবীর শিক্ষাপদ্ধতিতে মিশ্রভাবে প্রতিফলিত হয়েছে : প্রথম দৃষ্টিকোন হলো, উন্নতির সুযোগ লাভ ও তার বাধাগুলো দূর করাই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ; দ্বিতীয় মতে, সমাজের মানুষকে সংস্কৃতিমান করে তাদের যোগ্যতাকে চূড়ান্ত মানে উন্নীত করা এবং তৃতীয়দের ধারণা, সমাজকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার পরিবর্তে সামগ্রিক স্বার্থে ভাবনার কল্যাণকর প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করাই শিক্ষার মৌল উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ।

বিশ্বায়নের বিপুল বিপত্তির বিপরীতে ধর্মবোধ ও নীতিচেতনার কম্পমান শিখাটি এখনো আলো ছড়াচ্ছে এদেশে, তাই তিন যুগ ধরে স্বকীয় শিক্ষাদর্শন অনির্ণয়ের অনুযোগ স্বীকার করেও দেখি যে আমাদের সকল ধারার পাঠক্রমেই যেভাবেই হোক ধর্ম ও নৈতিকতার অস্তিত্ব টিকে রয়েছে এবং জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া বহুবিলম্বিত জাতীয় "শিক্ষানীতি ২০০০"-এ তা ইতস্ততভাবে হলেও প্রতিফলিত হয়েছে এভাবে : "ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নৈতিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাকল্পে শিক্ষার্থীর মননে, কর্মে ও ব্যবহারিক জীবনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা..... শিক্ষার্থীদের চিন্তাচেতনায় দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবোধ এবং চরিত্রে সুনাগরিকের গুণাবলি (যেমন ন্যায়বোধ, কর্তব্যবোধ, শিষ্টাচারবোধ, মানবাধিকার সচেতনতা, সহজ জীবনযাপনের মানসিকতা, সৌহার্দ, অধ্যবসায় ইত্যাদি)-র বিকাশ ঘটানো।" এই সুন্দর কথাগুলো শুধু কাগজে না হয়ে যদি শিক্ষার্থীদের জীবনেও সত্যি প্রতিফলিত হতো! কিন্তু আমাদের ধার করা ধারণার পাঠ্যবইগুলি তো তার ধার ধারছে না । এ জাতির শেকড়হীন পরমুখিতা ও চিন্তার অস্থিরতার একটা প্রমাণ তো এই যে এদেশে শিক্ষার বুনিয়াদ যেখান থেকে সেই প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১১ ধরণের; ব্র্যাক স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ইত্যাদির পাশাপাশি কিছু মাদ্রাসা উত্তীর্ণরাও দেখাদেখি ভাড়া করা বাড়িতে কথিত ক্যাডেট মাদ্রাসা খুলে সরল ধর্মপ্রাণ মধ্যবিত্তের প্রজন্মকে দুনিয়া ও আখিরাতের কামিয়াবির সনদ দেয়া শুরু করেছেন। আমাদের নতুন প্রজন্ম এইসব বিচিত্র প্রতিষ্ঠানে পড়ে যে পরস্পরবিরোধী সাংঘর্ষিক মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে তাতে আগামীর বাংলাদেশ কোন কৃষ্ণসাগরের কূলে গিয়ে দাঁড়াবে, ভেবে কূল পাওয়া মুশকিল। এদেশে তিন ঘন্টার একটি চলচ্চিত্রকে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর ছাড় দেবার ব্যবস্থা রয়েছে, রয়েছে কোনো প্রকাশনা মূল্যবোধকে আঘাত করছে কি না তা নিরীক্ষণের চেতনাও, শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে যাচ্ছেতাই স্বাধীনতা, কে কী শেখাচ্ছে সেটি দেখার কেউ নেই।

আমরা ভুলে যাচ্ছি যে শিক্ষা এবং জ্ঞান এক কথা নয়। জ্ঞানের উদ্দেশ্যেই শিক্ষা। তাই জ্ঞানীমাত্রই শিক্ষিত, কিন্তু সব শিক্ষিত জ্ঞানী নয়। শিক্ষা মানে শেখা । এ অর্থে মিথ্যা বলবার চাতুর্য যিনি শিখেছেন তিনি শিক্ষিত। এ শিক্ষা অর্জন করেছেন বলেই তিনি আদালতে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। কিন্তু একজন জ্ঞানী শিক্ষিত কিছুতেই এটা করবেন না, কারণ আত্মাকে সকল ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত করে ইনসাফ ও মানবতার পাঠ তিনি শিখে নিয়েছেন।

স্কুল : ইশ, কেনো যে এতো স্থূল!
সমকালের সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাথায় একটি স্থূল ধারণা চেপে বসেছে। এরা জ্ঞান বলতে বোঝে তথ্য। পৃথিবীর দীর্ঘতম বৃহত্তম উচ্চতম এইসব তুচ্ছতম বিষয়। বিভিন্ন দেশের মৃত্যুহার, মাথাপিছু আয়, মুদ্রা, ঘটনার তারিখ। তথ্য আদৌ দরকার নেই তা বলি না, তবে এর বিপরীতে তত্ত্ব কতোখানি বোঝা হলো, বোধের সঞ্চয় কতোটা, তা যদি তলিয়ে দেখেন, আশা করি আপনি দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সামনে আদর্শ ও নৈতিকতার কোনো মানদণ্ড উপস্থাপন করে না, ফলে স্বকীয় সংস্কৃতি দূরে থাক আত্মপরিচয় নিয়েই এরা দ্বন্দ্বে ভোগে। আমার মৌল পরিচয় কোনটি; মুসলমান, বাঙালি না বাংলাদেশি? শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জরিপ করে দেখুন আমাদের বিশ্বাসগত জাতিত্ব কতোটা ঐক্যবদ্ধ! যা শেখানো হচ্ছে সেই পাঠক্রমটাই যে ত্রুটিপূর্ণ, এ কথা বলবার যোগ্যতা যাঁদের আছে, তাঁরাই বলুন । বহু শিক্ষা কমিশন বহুবার এই ব্যর্থ গবেষণা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে । কিন্তু মৌলিক পরিবর্তনের স্বপ্ন পরাহত। তাই 'কী শিখছি' রেখে আসা যাক 'কতোটা শিখছি'র দিকে। এ বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুবই তেতো। বিভিন্ন পরীক্ষায় যারা জিপিএ-৫ পেয়ে মেধাবী বলে নন্দিত হয়েছে তাদের অধিকাংশই বাংলা বা ইংরেজিতে নির্ভুলভাবে একটা চিঠি লিখে ফেলতে পারবে, এতো অমূলক আশা আমি পোষণ করি না। ইংরেজি না হয় বিভাষা, বাংলা 'আ' উপসর্গের অর্থ জিজ্ঞেস করলেই এরা হাঁ করে তাকায়। কারণ পাশের হার আজকাল আর শিক্ষার মান নির্দেশক নয়। এর কারণ, বড় কথা বড় মুখ থেকেই শুনি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এম সাইদুর রহমান খান লিখছেন : "আদর্শহীন বাণিজ্যিক মনোভাবাপন্ন শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার্থীর পরিবর্তে পরীক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলছেন । অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও চর্চার পরিবর্তে কী উপায়ে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা যাবে সেভাবেই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। প্রশ্নের ধারাও পরিবর্তন করা হয়েছে। কতোটুকু প্রশ্নের কতোটুকু উত্তর, তা নোট আকারে ছাত্রছাত্রীদের সরবরাহ করা হয়। প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে করলেই পরীক্ষার্থী আর উত্তর দিতে পারে না। কারণ নোট যেভাবে করা আছে তার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। যাকে বলে Spoon Feeding. একেবারে রোবটের মতো প্রশ্নের উত্তর শেখানো হয়। যেহেতু অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী টেক্সট বই পড়ে না, তাই প্রশ্ন একটু বাঁকা হলেই আর তার উত্তর মেলে না। আর যদি মুখস্থ করা নোট অনুযায়ী প্রশ্ন আসে, তাহলে তো একেবারে পোয়াবারো, জিপিএ-৫ অবধারিত। সুতরাং জিপিএ-৫ পেলেই যে সে মেধাবী ছাত্র তা কোনো সহজ সরল সমীকরণের মাধ্যমে প্রমাণ করা যাবে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রতিটি আসনের বিপরীতে শতাধিক প্রার্থীর যুদ্ধে জয়ী হয়ে যারা ভর্তি হয়, সেই মেধাবীদের সম্পর্কে ড. খানের অভিজ্ঞতা, "নানাভাবে আমি ক্লাসে তাদের মেধা যাচাইয়ের চেষ্টা করি। সত্যি কথা বলতে কী আমি তাদের পারফরমেন্সে মোটেই সন্তুষ্ট নই। আগেই উল্লেখ করেছি এদের অধিকাংশই জিপিএ-৫ বা স্টার মার্কস পাওয়া ছাত্র। ইংরেজিতে ৮০% মার্কস পাওয়া ছাত্রছাত্রীও আছে, যাদের অধিকাংশ শুদ্ধভাবে একটি প্যারাগ্রাফ লিখতে পারে না। আমার অন্যান্য সহকর্মীদের অভিজ্ঞতাও একই রকম। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সবচে' পছন্দনীয় বিষয়ে ভর্তিকৃত ছাত্রছাত্রীদের পারফরমেন্স যদি এমন হতাশাব্যঞ্জক হয় তবে অন্যান্য বিষয়ের অবস্থাও যে তথৈবচ তা সহজেই অনুমেয়। কাজেই জিপিএ-৫ পাওয়াতে সাধারণভাবে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকের মাঝে উচ্ছ্বাস ও উল্লাস এবং শিক্ষা উপদেষ্টার আত্মতৃপ্তি এগুলো এক বিষয়, আর শিক্ষার মান উন্নয়ন অন্য বিষয়। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার্থী হিসেবে নয়, প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই আমাদের প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করতে হবে।" (যায়যায়দিন: ১৯, ০৯, ০৮)

কওমী : কর হেনে দ্বারে নবযুগ ডাকছে তোমারে
বাংলাদেশে কঠোর আদর্শবাদী জ্ঞানগৃহ হলো কওমী মাদ্রাসা। বাগদাদের নিযামিয়া সিলেবাসকে অনুসরণ করে মুঘল আমলে প্রণীত এর পাঠক্রমটি ফিক্হ ও নাহুপ্রধান হিসেবে প্রশংসিত হলেও যুগ যুগ ধরে 'আকাবির আকাবির' বলে সময়ের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে আসছে, ফলে এই সিলেবাস এখন মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রাচীন ও জীবনবিমুখ সিলেবাস । অযৌক্তিক উর্দুপ্রীতির পরিণাম দাঁড়িয়েছে এই যে ছাত্ররা তো বটেই, দাওরায়ে হাদীস মাদ্রাসার অধিকাংশ শিক্ষকই আরবী, ইংরেজি এমনকি মাতৃভাষা বাংলাও শুদ্ধ করে বলতে পারেন না। একটা চিরকুট ভাষান্তর করতে হিমশিম খান। তাই দেওবন্দ-করাচি থেকে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফেরা এ আলিমগণ ক্ষুদ্র বৃত্তে তাদরীস ও ইমামত ছাড়া দেশ ও জাতির নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। কেউ কেউ ইসলামিয়াতের ওপর 'দেওবন্দিয়্যাত' নামক অর্থহীন শব্দকে মতবাদ হিসেবে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন, অথচ পুরো জাতি যে একটা নাস্তিক্যবাদী চক্রের কবলে আটকে আছে সে নিয়ে তাঁদের তেমন চিন্তিত বলে মনে হয় না। তবে সনাতন বৃত্তে ভাঙন শুরু হয়েছে। আসছে নতুন সময়, কান পেতে শুনছি তার পদধ্বনি। গবেষণা চলছে, কলম এগুচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে কওমী সিলেবাস; আশায় বুক বেঁধে আছি। আশাবাদের ভিত্ যাঁরা গড়ে দিয়েছেন, পরিবর্তনের পথিকৃৎ সেই উলামা কিরামের প্রতি সালাম।

আলিয়া : মুদ্রণ চাই হৃদয়ে
আলিয়া মাদ্রাসা ওপরের দু' ধারার আপাতসুন্দর সমন্বয়। তবে সূক্ষ্মদৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে এ সমন্বয় করতে গিয়ে পাঠক্রমটাকে যথেষ্ট ভারি আর কিছুটা খাপছাড়া করে ফেলা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের চরিত্রে এর কাঙ্ক্ষিত প্রতিফলন ঘটছে না বরং এরা জড়িয়ে যাচ্ছে ইসলাম ও পশ্চিমা সংস্কৃতির এক অযৌক্তিক মিশ্রণের দ্বিধায়। সুন্নাহ্ অনুসরণে এদের ঔদাসীন্য কী করে সারানো যায় তা সংশ্লিষ্টদের ভাবা দরকার। এ ব্যত্যয়টুকু বাদ দিলে আলিয়া পাঠক্রমকে তুলনামূলক আধুনিকই বলা যেতে পারে।

মানুষ, মানুষ

না, জীবনের পাতায় বৃত্ত এঁকো না
কৃত্রিম-সুন্দর মিশেলের রঙধনুও
বইয়ে দাও জীবন, দুয়ার খুলে
শ্বাস নাও প্রান্তরভরা কুয়াশায়
কাঁপন জাগুক, আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠুক
মানুষ, অন্তর্গত মানুষ!

মানুষের চোখে আমি দেখেছি অলোক তারার ছটা
তাকে বৃথা প্রশ্ন করো না -- ‍"তুমি কে?"
হৃদয়ের আয়তনে আমি দেখেছি মহাপৃথিবী
তুমি ঘরের কথা রাখো।
স্রষ্টার স্বাক্ষর যে মুখে জ্বলছে নক্ষত্রের মতো
তাতে ছিটিয়ে দাও এক আঁজলা শ্রদ্ধা
হীনমন্যতার আড়াল নয়।

প্রচারমাধ্যমের সত্য

আজকের মানুষ ঘুম থেকে জেগেই যা খোঁজে, সে পত্রিকা। দ্বন্দ্বময় সময় মানুষের কৌতূহল উস্কে দিয়েছে। কী জানি ঘুমের সময়টায় কী ঘটে গেছে! আশা-উৎকন্ঠার ঘনঘটায় দোলায়িত জীবন। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি। পুরো পৃথিবী একবার দেখতে কয়েক মিনিট লাগে -- জাস্ট ক্লিক। ই-মেইলে নিউজ এলার্ট দিয়ে রাখুন, খবরের জোয়ারে ইনবক্স উপচে উঠবে। খোঁজাখুঁজি করতে হবে না।

তো একদিন আমেরিকার লোকজন ভোরবেলায় পত্রিকা খুলেই দেখলো কাগজের ভাঁজের ভেতরে সিডি, 'অবসেশন', কোটি কোটি মানুষের কাছে একই দিনে পৌঁছে গেলো কোটি কোটি সিডি। প্রচ্ছদে পাঞ্জাবি-টুপি পরা মুসলমান, হাতে উদ্যত অস্ত্র। ভেতরে যে চলচ্চিত্র, তাতে বুঝানো হল ইসলাম ভয়াবহ একটা ব্যাপার, মুসলমানরা পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যে সবচে' বড় ঝুঁকি। সরল খৃস্টানরা -- ধর্ম নিয়ে যারা খুব একটা মাথা ঘামায় না, আর তার ফুরসৎও নেই -- দেখে প্রমাদ গুনলো; মুসলমানদের থেকে আরো সতর্ক হতে হবে। উৎসাহী ও উদ্দেশ্যবাদীরা মুখর হলো, ছড়ালো, যেনো এ এক দলিল। মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হলো। সারা পশ্চিম জুড়ে শুরু হয়ে গেলো তুমুল তর্ক।

এ হলো প্রচারমাধ্যমের শক্তি। রয়টার্স-বিবিসি-সিএনএন-টাইম হলো সত্যের মাপকাঠি। আপনি মানুন আর না-ই মানুন। পরমাণু বোমা ফাটিয়ে একটা দেশকে ছাই করে ফেলা যেতে পারে, তবে মানুষকে এটা বিশ্বাস করানো যাবে না যে দেশটাকে পুড়িয়ে ফেলাই উচিৎ। মিডিয়া দিয়ে তা সম্ভব। এভাবে জায়েয হচ্ছে আমেরিকার আগ্রাসন, মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে স্থাপিত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের আধুনিক উপনিবেশ। শান্তি, শান্তি এবং শান্তির আদর্শ ইসলামকে বিকৃতভাবে প্রচার করা হচ্ছে। কোনঠাসা হয়ে পড়েছে মুসলমান। তাদের কানের কাছে বাজছে যে লাউডস্পীকার, তার মাইক্রোফোন ইহুদীদের হাতে। ময্লুম মুসলমানের আর্তচিৎকার তাই শুধুই অরণ্যে রোদন।

প্রচারমাধ্যমের ওপর ইহুদীদের এই একচেটিয়া আধিপত্য দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। এককালের উদ্বাস্তু জাতির ধ্বংসাবশেষ গুটিকয় ইহুদীর কাছে সারা পৃথিবী আজ জিম্মি। তাদের বানানো খবরগুলি আমরা কিনে এনে নিজেদের পত্রিকা-টিভিতে প্রচার করছি। এই প্রেক্ষাপট সামনে রেখে সিদ্ধান্তে আসা যায় -- যতোদিন মুসলমানরা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারছে, ততোদিন তাদের দুর্গতির কোনো প্রতিকার নেই।

ক্ষুদ্র বৃত্তে মুসলমানদের যে কয়টি পত্রিকা আর টিভি আছে, সেগুলো আশাহীনভাবে বিচ্ছিন্ন। পরস্পরে কোনো যোগাযোগ নেই। অথচ ডেনমার্কের পত্রিকায় যখন রাসূল সা. কে নিয়ে আপত্তিকর কার্টুন ছাপা হয়, আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম প্রবল প্রতিবাদের মুখেই ওই কার্টুনটি ইউরোপের প্রায় সকল পত্রিকায় পুণর্মুদ্রিত হলো। ইসলাম বিদ্বেষে ওরা সবাই কী নির্লজ্জের মতো এক হতে পারে, এটি তার দৃষ্টান্ত। এর বিপরীতে মুসলিম মালিকানাধীন মিডিয়াগুলোকে তেমন উচ্চকন্ঠ হতে দেখা যায় নি। বিচ্ছিন্নতার সাথে সাথে এটি হীনমন্যতার প্রমাণও বটে।

ষাট বছরের বেশি সময় ধরে যে ফিলিস্তিন নির্মম সন্ত্রাসের শিকার, বোমার ধোঁয়ার ভেতরে শ্বাস নিয়ে যারা মরতে মরতেও বেচেঁ আছে কোনোমতে, তাদেরকেই আজ বলা হচ্ছে সন্ত্রাসী। এরচে' অমানবিক ব্যাপার আর কী হতে পারে! সত্যকে আড়াল করবার জন্যে প্রতিনিয়ত মিডিয়াকর্মীদের দিয়ে নানা ইস্যু তৈরি করাচ্ছে ওরা, জনমত গড়ছে এসব ইস্যুর পেছনে। রাজনীতিকরা এসব ইস্যুর পেছনেই কাজ করছে, কাজ করতে বাধ্য, মিডিয়ার কাছে তারা অসহায়। এভাবেই মিডিয়া আজ বিশ্বরাজনীতির প্রধান নিয়ন্তা।

আধুনিক সভ্যতার অন্ধকার দিক হলো, দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্ব। পত্রপত্রিকায় উন্নয়নশীল দেশগুলো নিয়ে রোজই আমেরিকার নানা পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়। এ অধিকার তাকে কে দিলো? মিডিয়া প্রচার করছে যে, আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ যারা এটা ছড়াচ্ছে সেই সাংবাদিকরা ভালো করেই জানে যে আমেরিকা এটা কখনোই চাইবে না। নির্জলা ভণ্ডামি! মধ্যপ্রাচ্যের জুব্বাঅলা শাসকরা সাম্রাজ্যবাদের সবচে' বিশ্বস্ত ভৃত্য। ইসলাম ও মানবতার শত্রুদের দোসর। তাদের প্রভুদের প্রয়োজনেই তাদের রাজতন্ত্র দরকার, যাতে পরাশক্তির দাসত্বের বিরুদ্ধে কোনো নাগরিক কথা বললে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়। যাতে তেলের খনিতে পুঁজিবাদের শেকড় নিশ্চিন্ত নিরাপত্তায় ছড়াতে পারে। কাজেই মুসলিম দেশসমূহে আমেরিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রচারমাধ্যমের সত্য, বাস্তবতা নয়।

জীবনের সকল ক্ষেত্রের যুক্তিপূর্ণ নির্দেশক ও সতত সমপ্রসারণশীল জীবনব্যবস্থা ইসলামের প্রতি পাশ্চাত্য কখনোই সহনশীল ছিলো না। তবে বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র সরকার মুসলমানদের ওপর যতো খড়্গহস্ত হচ্ছে সে দেশের নাগরিকদের ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা ততোই বাড়ছে। সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ক্ষেপে যায়, গণমাধ্যমে প্রবলভাবে শুরু হয় ইসলাম-আতঙ্ক ছড়িয়ে দেবার কাজ, শত শত কলামিস্ট আর বুদ্ধিজীবী নিয়োগ করে মুসলিম বিশ্বে আমেরিকার সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপট তৈরির জন্যে। এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর কাভারিং ইসলাম বইয়ে বিস্তর তথ্য দিয়েছেন, ক্যাম্পডেভিড চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি হলে সাঈদকে তা সারাবার দায়িত্ব দেন প্রেসিডেন্ট কার্টার, এ কাজ করতে গিয়েই সাঈদ মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্রের অনেক নাড়ির খবর জেনে ফেলেন।

গণমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এ ছাড়াও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। বাংলাদেশে সত্যনিষ্ঠ সংবাদকর্মীর পাশাপাশি কিছু আত্মবিক্রীত দালালের উপস্থিতি টের পাচ্ছি, যারা ট্রানজিটসহ নানা ভারতস্বার্থের পক্ষে সোচ্চার। একটি সামাজিক সংগঠন দরকার, যে এদের চিহ্নিত করে জাতিকে সতর্ক করবে। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলাম-বিদ্বেষী প্রচারণার মুকাবিলায় মুসলমানদের উচিৎ ইসলামের সত্যিকার আদর্শ ও শুদ্ধতম চেতনাকে বহুমাত্রিক উপায়ে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা। কয়েকটি বহুভাষিক টিভি ও রেডিও চ্যানেল প্রয়োজন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও কুরআন-সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি রাসূল সা. ও সাহাবা কিরামের সুন্দর জীবনের ওপর যেগুলো আলোচনা, কথিকা, সেমিনার, বিশেষ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের ওপর নাটক ও চলচ্চিত্র প্রচার করবে। ইরানী কালচারাল সেন্টার ও তেহরান বেতারের কাজকে এখানে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করছি, তবে বহু কোলাহলের ভেতর এই একক কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে আছে। প্রচারযুদ্ধে কোনঠাসা মুসলিম দেশগুলোর আর ঘুমিয়ে থাকার সময় নেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এবার ঘুরে দাঁড়াবার পালা।

উদ্ধত ইসরাইল : লুণ্ঠিত মানবতা

ইসরাইল শব্দটি উচ্চারিত হলে আজ আর কোনো জনপদের কথা মনে পড়ে না, আদতেই কোনো দেশ নয় এটি। ওখানে কোনো মানুষ থাকে বলেও কোনোদিন শুনি নি। তবে যারা থাকে, তাদের রক্তপাতের কথা শুনেছি, মানবতার বিরুদ্ধে ওদের চক্রান্ত আর যুদ্ধের কথা শুনেছি, মানুষকে রক্তে ভাসিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারার গল্প শুনেছি, এবং শুনেই যাচ্ছি। ইসরাইল তাই কোনো দেশ নয় -- বরং মূর্ত অন্যায়, উগ্র অমানুষিকতা!সারা দুনিয়ার বিবেকবান মানুষের প্রতিবাদ এরা গায়ে মাখছে না, গায়ে মাখার দরকার নেই বলে। কারণ প্রতিবাদ করলেও প্রতিরোধ করতে কেউ এগিয়ে আসবে না। যে সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলি এদের নেপথ্য পালনকর্তা, তাদের দিকে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলবার মতো একজন আহমেদিনেজাদ হয়তো আছেন, কিন্তু এদের থামাতে হলে তো আরো আহমেদিনেজাদ দরকার। মুসলিম বিশ্বের সেই স্বপ্ন দেখার দিন ফুরিয়েছে। যে ছদ্মবেশে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিম একদা আরব নেতাদের জাতীয়তাবাদের মদ খাইয়ে ইসলামী খিলাফত ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছিলো, তারা সে খোলস খুলে ফেলেছে। কারণ বিভক্ত মধ্যপ্রাচ্যের যে আর মাথা তুলে দাঁড়াবার জোর নেই, এ সবাই জানে। ওই আরব রাষ্ট্রগুলি বাইরে আমেরিকার দোসর, ভেতরে তাদের দাস। কাজেই বৃষ্টির মতো বোমা ফেলো। নিরীহ লোকদের চিৎকারে কান দেবার দরকার কী, আমেরিকাকে ঠেকাতে কোনো মিত্রশক্তি তো জেগে উঠছে না।পঞ্চাশ বছর ধরে নির্বিচার হত্যা আর নির্মম ধ্বংসযেজ্ঞর শিকার, নিজভূমে পরবাসী ওই ফিলিস্তিনের অসহায় মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি মানবতার কোনো অর্থ খুঁজে পাই না। জাতিসংঘ ওই ধূর্ত ইহুদিদের শিখণ্ডি আর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সরকারগুলি এদের প্রভু। ফলে বিশ্বের বিবেকবান মানুষের প্রতিবাদ আজ নিছকই ব্যর্থ শোকে পর্যবসিত হয়েছে, পরাজিত হয়েছে মানবাধিকার। দিনের পর দিন এ নির্মম হত্যাযজ্ঞ দেখতে দেখতে বোধহয় চেতনাও ভোঁতা হয়ে গেছে, তাই আগে যেমন পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হতো, ইসরাইলের সাম্প্রতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে ততোটা উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ দেখা যায় নি। আসলে ওই যালিম ইহুদিদের টুঁটি চেপে ধরা ছাড়া এ যুলুমের কোনো প্রতিকার নেই। সেটি খুব সহজেই সম্ভব যদি মুসলিম দেশগুলো একবার বলে যে ইসরাইল ভূখণ্ডটি তার ন্যায্য অধিকারী মুসলমানদের হাতে প্রত্যর্পনের আগ পর্যন্ত তেল উত্তোলন বন্ধ থাকবে। মুসলমানদের এই শক্তিটা এখনো আছে যে তারা ইচ্ছে করলেই এক মুহূর্তের নোটিশে সারা বিশ্বকে অচল করে দিতে পারে। মুসলমানদের সেই সাহস আর আত্মবিশ্বাস কি কোনোদিন জেগে উঠবে না?

তারুণ্যের স্বপ্ন ও নেশা

সত্যি কথা বলতে কী, যা কিছু দেখি ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করে। পঁচা সভ্যতার দেয়ালে রং মাখিয়ে কী লাভ! এই যে সবাই গাইছি, আঁকছি, ডাকছি আর শৈল্পিক কোলাহলে ভেসে যাচ্ছি, তাতে আত্মপ্রসাদ যেটুকু পাই তাই সঞ্চয়, তাৎপর্যের নতুন অঙ্কুর দল মেলতে দেখি না।

আমাদের তাই নতুন করে শুরু করতে হবে।

পঁচা আর পুরনোকে ভেঙে ফেলবার দাবি দায়বোধের নয়, সাহসের। দুর্দান্ত আঠারো বা একুশ মাথা নোয়ায় না। তার চোখে সমুদ্রের নীল, স্বপ্নে অনন্তের ছায়া। সেই ছায়ায় বিস্তীর্ণ জীবনের নিভৃত বুনন। সম্ভাবনার মাপজোখ নয়, তার আছে এক যুক্তি-উর্ধ স্পর্ধা। আছে নির্বিকার উপেক্ষায় সকল কিছু লঙ্ঘন করে যাওয়া, সত্তার সেই কেন্দ্রে, যেখানে সে আপনাকে খুঁজে পায়।

আমরা সেই পথেই হাঁটছি।

হাঁটছি এবং দেখতে পাচ্ছি পথে জমে আছে জঞ্জাল, স্তূপের পর স্তূপ -- বুদ্ধিবৃত্তিক জঞ্জাল, চিরাগত সংস্কারের জঞ্জাল, অপচিত মেধার ক্লেদ আর শিক্ষার জঞ্জাল। পণ্ডিতরা আমাদের শেখাতে শেখাতে ভাবনার ফুরসৎ দিচ্ছেন না যে আসলে আমাদের কী ভাবা উচিৎ এবং কেনো। মস্তিষ্কের নিউরনে ভরে বিবিধ পদার্থ নিয়ে এসেছেন বিলেত থেকে, বিলাতে চাইছেন উদার, যাতে আমাদের ইহজন্ম কৃতার্থ হয়। গুরুজনরা চান যেনো তাঁদের স্নেহের বলয়ের ভেতর তাঁদের মতোই বেড়ে উঠি। আর বাহারি তকমা দেওয়া বিদ্যালয়গুলি সহজাত সৃজনশীলতাকে চেপে রাখার যুৎসই পাঠক্রম তৈরি করেছে; শ্রদ্ধেয় পণ্ডিতমশাইরা সফেদ কাপড়ে হৃদয়কে আড়াল করে যখন বিদ্যাব্যাবসা করেন, বোধের অসহায়ত্ব টের পেয়ে যাই বলে কষ্ট হয়; তাঁদের প্রতি বিনীত করুণা।

বিষম ঘোর তৈরি হয়েছে, আর তার ভেতর দিয়েই হাঁটছি।

চাইছি উদ্বোধন, নতুনের এবং মানবাত্মার অমর আলোকের ছটা, দীপায়িত জীবনের গান, কিন্তু তারুণ্যের কানে অদ্ভূত সুরযন্ত্র, তাতে ফূর্তি, ৮৯.৮, আহা হা, 'ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান...' কী গান, আর কথায় ইংরেজি-বাংলার উদ্ভট মিশেল, জিজ্ঞেস করলাম, 'জগাখিচুড়ি কেনো, শুদ্ধ বাংলা বলতে পারো না?' বেতারের ওই সঙের জবাব, 'আমি আপনার কমেন্ট সিরিয়াসলি প্রোটেস্ট করছি।' শুনে হেসে বাঁচি নে। বারবার অনুরোধ করে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত আদায় করতে পারি না। প্রাচ্যকে ওরা তুচ্ছ ভাবে, ইকবাল-রবীন্দ্রনাথ বোঝে না -- কথায় পশ্চিম, মাথায় পশ্চিম, সুরে পশ্চিম, গায়ের গেঞ্জিতে পশ্চিম! তবু পাশ্চাত্যের ভালোটা কিছু যদি নিতে পারতো, তা না, ওই উচ্ছিষ্ট চিৎকার।

বিশ্বায়নের নেশায় আত্মাহুতি দেয়া এ তরুণদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, বাড়ছে আমাদের উদ্বেগও। আমরা এদের ফেরাতে পারবো কি না জানি নে, জানি যে সেই চেষ্টাটা করবো।

আমরা এখন এখানে বসে কথা বলছি, ওদিকে ফিলিস্তিনে বোমা পড়ছে, রক্তে ভাসছে আগুনে পুড়ছে মানুষ, ফুলের মতো অসংখ্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে অবেলায়, বিশ্ব তাকিয়ে আছে নির্বিকার আর জাতিসংঘ নামক নাট্যশালা থেকে আসছে শুধু আহবান। হায় মানবতা! তাকিয়ে দেখার মানুষ আছে, ওই যালিমদের টুঁটি চেপে ধরবার কেউ নেই। আমরা বিবেকের দুয়ারে তালা ঝুলিয়ে দৈশিক ও ভাষাগত জাতীয়তার সংজ্ঞার ভেতরে বসে বিজ্ঞের মতো অভিমত দিচ্ছি যে এটা ঠিক হচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে, জাতির প্রাণশক্তি যে তরুণ, তাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, টেলিভিশনের পর্দায় ক্রিকেটের বলের সঙ্গে এরা কেমন লাফায়, একটা জয় পেলে সারা রাত পথে পথে দল বেঁধে চেঁচায়। অথচ শত শত বোমায় অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণহাণির দৃশ্য দেখে এদের ভাবান্তর হয় না। তাহলে, বল এবং বোমা, এ দু'টির মধ্যে কোনটি এদের বেশি প্রভাবিত করে? এ দৃষ্টান্তের পর, সমকালীন তারুণ্যের মূল্যবোধ সম্পর্কে বোধহয় কিছু আর বলবার থাকে না।

একুশ শতকের মানুষ খেলার মতো ফেলো বিষয় নিয়ে এতো হইচই করে কেনো, আমি ভেবে পাই না।

বাংলাদেশের উলামা কিরামের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা পোষণ করি, তবে এটা বলতেও দ্বিধা করি না যে, এদেশের তরুণদের বিশাল একটা অংশকে তাঁরা ঐন্দ্রজালিক বৃত্তের ভেতর আটকে রেখেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, জাতির ঠিক নেতৃত্ব ও পথনির্দেশনার যথাযথ যোগ্যতা এবং অধিকার তাঁদেরই, যেহেতু নায়েবে নবী; অথচ সেই অবস্থানে তারা নেই এবং ছিলেনও না। এর কারণ কী সেই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো না, কেননা এর যে জবাব তাঁরা দেবেন তা আমরা জানি। শুধু বলবো যে তরুণদের বৃত্তের বাইরে যেতে দিন, বই পড়তে দিন, অবাধ জ্ঞানচর্চার সুযোগ দিন যাতে সত্য আর মিথ্যাকে পাশাপাশি রেখে ঠুকে ঠুকে পরখ করে দেখতে পারে। কুয়ার পানির মাসআলা শিখুক, তবে তার পাশাপাশি তথ্যসমুদ্র ওয়েবেও যেনো সাঁতার দিতে শেখে।

প্রচারমাধ্যমগুলো সত্যিই আমাদের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

একটি জাতির সভ্যতা ও মননশীলতার স্বাক্ষর হলো তার সাহিত্য, যুগান্তরের বোধের সঞ্চয়। এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক ইতিকথা বলবার যথেষ্ট অবকাশ আছে, কেননা আমাদের আছেন সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো কিছু আলোকিত মানুষ, যাঁদের নিয়ে রীতিমতো গর্ব করা যায়। তবে তরুণদের মধ্যে একটা খাপছাড়া ভাব বড্ড চোখে লাগে, বিশেষত কবিতায়, আমার মনে হয় কেউ কেউ জোর করে কবি হবার চেষ্টা করতে গিয়েই গোলটা বাধিয়েছেন; ভেতর থেকে উঠে আসা নয়, বরং শব্দবোধজাতীয় অভিধান ঘেঁটে উপমা-অনুপ্রাসের তালিকা করে সেগুলোকে অর্থময় করবার জন্যে টেনে আনা ভাবের জোড়াতালি, এভাবে ভালো কিছু তৈরি হয় না এবং সময়ে এরা আপনিতেই ছাঁটাই হয়ে যায়। সাহিত্যের বিপুল প্রবাহের ভেতরে আমরা মৌলিক কিছু করতে পারি, উত্তরাধুনিকতা-পরাবাস্তবতার বিপরীতে একটা নতুন ধারা, এবং সেটি আমাদের মুখ্য এক ভাবনা।

রবীন্দ্রনাথ বলাকার প্রথম কবিতায় অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচার কথা বলেছেন, যার ভেতর প্রবীণরা চোখ-কান ঢেকে বসবাস করেন; তাঁর ভাষায়:

খাঁচাখানা দুলছে মৃদু হাওয়ায়
আর তো কিছুই নড়ে না রে
ওদের ঘরে, ওদের ঘরের দাওয়ায়,
ওই যে প্রবীণ ওই যে পরম পাকা
চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা
ঝিমায় যেনো চিত্রপটে আঁকা
অন্ধকারে বন্ধ করা খাঁচায়
আয় প্রমুক্ত আয়রে আমার কাঁচা।

আমরা মুক্তি চাই স্পর্শকাতর ধর্মবোধের খাঁচা থেকে ইসলামের উন্মুক্ত বিশালতায়, উত্তরণ চাই অবরুদ্ধ অনুকারী উত্তরাধিকার থেকে মুক্তচিন্তার অন্তহীন নীলিমায়; আত্মা আলোকিত হোক, চিন্তা জাগ্রত হোক, মানবপ্রেমে উদ্বেল হোক হৃদয় আর সকল কোলাহল ছাপিয়ে উঠুক আমাদের মুক্তস্বর!!